নির্বাচন ইস্যুতে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলসহ স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থী নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিলের পর সেগুলোর প্রাথমিক যাচাই বাছাইও শেষ হয়েছে।
২০শে জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করতে পারবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এবার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগেই হামলা ভাঙচুরের অভিযোগও আসছে।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বহিস্কৃত বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা। অভিযোগ করেন, সোমবার তার একটি পথসভার জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করা হলেও তার প্রতিপক্ষরা সেটি ভেঙে দিয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শুরুর পর ভোটের মাঠে সহিংসতার পরিমাণও বাড়ে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন একটি প্রেক্ষাপটে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতি সোমবার জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন ভোটের মাঠে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ইসিতে এনসিপি অভিযোগ করে বলেছে, প্রশাসনের একপাক্ষিক আচরণের কারণে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও অতীতের মতো পক্ষপাতিত্ব এবং একতরফা আচরণের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে মানুষের মধ্যে। দলটি মনে করছে সামনেও একটি পাতানো নির্বাচনের আয়োজন হচ্ছে। একই দিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ জানিয়ে সিইসির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
দলটি মনে করছে, এবারের নির্বাচনে অনেকটা একপাক্ষিক আচরণ করছে নির্বাচন কমিশন। যাতে ভোটের মাঠের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ভারসাম্য হারাচ্ছে। এর আগে গত শনিবার একই অভিযোগ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীও।
প্রশাসনের একতরফা আচরণের অন্তত একশটি উদাহরণ রয়েছে বলে দাবি করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি'র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলছেন, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসন পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে দাবি করে তিনি বলেন, "সম্প্রতি একটি দলের চেয়ারপার্সন দেশে আসার পর বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ একটি পার্টি অফিসের দিকে তাদের কেবলা ঠিক করে ফেলেছেন। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ"।
প্রশাসনের এমন আচরণের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অতীতের মতো পক্ষপাতিত্ব এবং একতরফা হওয়ার শঙ্কা মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনিয়ম চলতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মাঠের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে অনেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন এবং একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) পক্ষপাতদুষ্ট ডিসি-এসপিদের সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনে কী কৌশল নেবে এমন প্রশ্ন ছিল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের কাছে। জবাবে তিনি বলেছেন, "যেভাবে হোক আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে কাজ করছি। আমাদের পক্ষ থেকে সবাইকে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে"।
তবে, এক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না, নির্বাচনী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত বলে বলছিলেন নির্বাচন বিশ্লেষক মুনিরা খান।
এদিকে নির্বাচনের আগে প্রশাসনের 'বিতর্কিত' ভূমিকা ইসির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবে বলে মন্তব্য করেছে অভিযোগকারী রাজনৈতিক দলগুলো।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলির মতে, নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনের।
অবশ্য পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের দরজা খোলা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, আপিলের পর নির্বাচন কমিশন কী করে সেটাও দেখা জরুরি।
"সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনে আপিল করবে, সেখানেও না হলে আদালত আছে," বলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনে একাধিক রাজনৈতিক দলের এমন অভিযোগ, প্রশাসনকে চাপে রাখার কৌশল কি না– এমন প্রশ্নের জবাবে টুলি বলছেন, "রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক কৌশল থাকে, এটিও তার একটি হতে পারে। কিন্তু যদি কোনো অভিযোগ থাকে নির্বাচন কমিশনের সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।"
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ অবশ্য বলছেন, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল কিছু অভিযোগ দিয়ে গেছেন, "বিষয়গুলো আমরা দেখবো।"
"যদি প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের বিষয়টা ঘটে থেকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রশাসনিকভাবে যেটা আছে। কিন্তু যাচাই বাছাই না করে তো কোনো কমেন্ট করা ঠিক না," বলেন আখতার আহমেদ।
ভিওডি বাংলা/এমএইচ/এমএম





