নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, হত্যা ও আইনশৃঙ্খলাজনিত অরাজক পরিস্থিতি তত বাড়ছে। বাড়ছে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক-উদ্বেগ। যদিও দেশে আইনশৃঙ্খলার এমন চিত্র নতুন নয়। বিগত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেও একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বলা ভালো, এ পর্যন্ত যত সংসদ নির্বাচন হয়েছে, প্রায় সবটিরই আগে-পরে টার্গেট কিলিং হয়েছে। শুধু কিলারগড এবং চক্রের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এ ধরনের খুনের প্রকৃত বিচার হয়নি। নির্বাচনের পর, নির্বাচিত সরকার সেসব খুনের বিষয়ে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে এ ধরনের খুন, প্রায় রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে গেছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীসহ বিগত সরকারের মূল নেতৃত্ব দেশত্যাগী, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন, সেহেতু সন্দেহের তীর তাদের দিকেই। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের পরে থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ শতাংশ অস্ত্র ও ৩০ শতাংশ গুলি এখনো উদ্ধার হয়নি। যা এখন নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
ভোট গ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। ভোটের প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। রাজনৈতিক দলগুলো এখন প্রার্থী চূড়ান্ত করা, জোটের আলোচনাসহ নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজ করছে। তবে নিরাপত্তার প্রশ্ন জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। যদিও নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ঢাকায় টার্গেট কিলিং এর শিকার হন ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান হাদি এবং গতকাল সন্ধ্যায় সোয়া ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সেলের মতবিনিময় সভায়জাতীয় নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার (অব.) ব্রিগেডিয়ার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যাতে কোনো ধরনের অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার না হতে পারে, এ জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার খুব জরুরি।
এদিকে টার্গেট কিলিং নিয়ে আতঙ্কিত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি নেতা, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। এমনকি হুমকিতে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।
সরকারের বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষ ও বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বানচালের পরিবেশ তৈরি করাই টার্গেট হামলার মূল উদ্দেশ্য। সরকার মনে করছে, এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা। তাদের মূল উদ্দেশ্য, সমাজে ভীতি-আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচন বানচাল করা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। জানিয়েছেন ‘রাজনৈতিক খুন প্রতিরোধ করতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার সবার আগে ঠেকাতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন শীর্ষপর্যায়ের সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়। ভয়হীন ভোটের পরিবেশ গড়ে তুলতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলো সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত শাস্তি বিধানের কথা বললেও, পরিকল্পিত হত্যাকা-গুলোর কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। অস্থিতিশীলতার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির মিশন নিয়ে নামানো হচ্ছে দেশি-বিদেশি সন্ত্রাসীদের।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে একটি প্রভাবশালী চক্র নেপথ্যে পেশাদার সন্ত্রাসী ও কিলারদের কৌশলে উসকে দিচ্ছে। মূলত নির্বাচন ‘বানচাল ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করতেই টার্গেট কিলিং’ হচ্ছে! এটা পরিষ্কার জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে একটি অপশক্তি। সত্যিকার অর্থে, সেই অন্ধকারের শক্তিকে যদি এ মুহূর্তে নিষ্ক্রিয় করা না হয় তাহলে সামনে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি থাকবে না।
গত সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত একটি নতুন নীতিমালা জারি করা হয়। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেন, ‘‘এতদিন আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স মূলত সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের অনুকূলে ইস্যু করা হলেও এখন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে যারা আবেদন করবেন, তাদেরও লাইসেন্স দেওয়া হবে।’’
ভিওডি বাংলা/ এমএম





