আইসিইউর ৪১ শতাংশ রোগী
প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মিলছে অ্যান্টিবায়োটিক

প্রেসক্রিপশন ছাড়াই পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিতেও মিলছে অ্যান্টিবায়োটিক। যথেচ্ছ ব্যবহারে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য। আই.ই.ডি.সি.আর-এর গবেষণা অনুযায়ী, ৪১ শতাংশ আইসিইউ রোগীর শরীরেই কাজ করছে না বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় চিকিৎসক, রোগী ও ওষুধ বিক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। ছবিতে ইংরেজি ‘R’ লেখাগুলো নির্দেশ করে রোগীর শরীরে অকার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক। শুধু একটি ওষুধ কাজ করায় বেঁচে আছেন রোগী।
বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল অ্যান্টিবায়োটিক। তবে, এর যথেচ্ছ ব্যবহার ডেকে আনছে বিপদ।
সাধারণ মানুষ জানায়, দু-তিনদিনে জ্বর না কমলে ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাচ্ছেন বেশিরভাগ সময়।
অপ্রয়োজনে বা ভুল ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে জীবাণু। এতে প্রয়োজনের সময় শরীরে কাজ করছে না এই ওষুধ। ক্ষেত্র বিশেষে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু রোগীকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
ফার্মেসিতে ওয়াচ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে অহরহ। মহামারির চেয়েও বড় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আসন্ন জেনেও এখন পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কোনো নীতিমালা করতে পারেননি নীতি-নির্ধারকরা। আর তাই, বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিগুলোতে দেদার বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক।
অ্যান্টিবায়োটিককে মূলত তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। প্রথমে এক্সেস গ্রুপ, দ্বিতীয় ওয়াচ গ্রুপ ও সবশেষ রিজার্ভ গ্রুপ। শঙ্কার বিষয়, যেখানে শুরু করার কথা এক্সেস গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক থেকে; সেখানে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই অনেক রোগী ফার্মেসি থেকে কিনছেন রিজার্ভ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক।
সেফটি নেট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর লে. কর্নেল ডা. হাসান আবদুল্লাহ বলেন, ‘ভাইরাল জ্বর-সর্দিতে অ্যান্টিবায়োটিকের রোল না থাকলেও দুদিনে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। এতে করে রোগী আর ব্যয়বহুল মেডিসিন খান, ওটা বন্ধ করে দেন। মূলম ভাইরাল রোগে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। এটা আমাদের জনগণকে মাথায় নিতে হবে। জ্বর হলেই একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে ফেলা; এটা করা যাবে না।’
তেমনই দ্বিতীয় প্রজন্মের ওয়াচ গ্রুপের সেফুরোক্সিম এক্সেটিলের অন্তর্ভুক্ত একটি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয় শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণসহ বেশ কিছু সংক্রমণরোধে। কিন্তু, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এটিও বিক্রি হচ্ছে অহরহ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার বলেন, ‘আমাদের দেশে দেখা যায় যে, একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে রিজার্ভগ্রুগ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তার চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু এক্সেস গ্রুপের মেডিসিন দিয়ে তার চিকিৎসা শুরু হওয়ার কথা। সাধারণ সর্দি-কাশি নিয়ে ফার্মেসিতে গেলে দেখা যায় খুব শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিয়েছে, অথচ যেখানে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের দরকারই ছিল না।’
আইইডিসিআরের গবেষণায় উঠে এসেছে, ৪১ শতাংশ আইসিইউ রোগীর শরীরে কাজ করছে না বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক। তবে, ভয়াবহতা ঠেকাতে প্রতিটি হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক ও ল্যাবরেটরি ডেটার মাধ্যমে পরিচালিত করার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘শুধুমাত্র রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকরাই অ্যান্টিবায়োটিক মেডিসিন লিখবে। এবং তাদের প্রেসক্রিপশনও অডিট বা মূল্যায়ন হবে, যেন এটা নজরদারি করা যায় যে, তারাও কোনো ক্ষেত্রে ভুল করে কিনা। অন্যদিকে, ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ফার্মেসিতে অ্যান্টিবায়োটিক এমনকি কোনো মেডিসিন বিক্রি করা যাবে না।’
আবার অ্যান্টিবায়োটিক সহজে চেনার জন্য লাল মোড়কে উৎপাদনের কথা থাকলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে কি?
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক ডা. আশরাফুল আলম বলেন, ‘উপজেলা লেভেল থেকেই যখন একজন রোগী চতুর্থ স্তরের অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে আসে, তখন রেফারেল হাসপাতালে আর অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার সুযোগ থাকে না।’
অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। গবাদিপশু, মাছ, মুরগি উৎপাদনেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এর ব্যবহার।
ভিওডি বাংলা/ এমএম/এমএইচপি





