১০২ হতদরিদ্রের নামে ৯৬৩ কোটি টাকার ঋণ

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাজীর পাড়ার বাসিন্দা রাসেল আহমেদ। জরাজীর্ণ মাটির ঘরে বসবাস করা রাসেল অসুস্থতার কারণে অন্যের সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতেও পারেন না। সেই রাসেলকে সাহায্য দেয়ার কথা বলে চার বছর আগে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেন এক ব্যক্তি। আজ অবধি কোনো সাহায্য পাননি তিনি। তবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী শাখায় তার নামে ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকার ঋণ সৃষ্টি হয়েছে।
রাসেল আহমেদকে রাসেল এন্টারপ্রাইজের মালিক সাজিয়ে ২০২২ ও ২০২৩ সালে তার নামে এ ঋণ নেয়া হয়। শয্যাশায়ী রাসেল জানান, ঋণের আবেদন তো দূরে থাক, কখনও এই ব্যাংকে যাননি তিনি। কোনো ব্যাংক হিসাবও খোলেননি। রাসেলের মতো এমন হতদরিদ্র ১০২ জনের নামে ইউসিবির চট্টগ্রামের পাঁচটি শাখা থেকে ৯৬৩ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে। খবর সমকালের।
কক্সবাজারের রামুর প্রত্যন্ত ঈদগড়ের পূর্ব রাজঘটে পাশাপাশি থাকেন মোহাম্মদ জহির উদ্দীন ও নুরুল ইসলাম। সম্পর্কে মামা-ভাগনে। চাটাইয়ের বেড়ার পাশাপাশি দুটি ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোনোমতে তাদের দিন কাটে। স্থানীয় বাজারের নাইটগার্ড জহির ও তার স্ত্রী উম্মে সালমাকে জহির ইন্টারন্যাশনালের মালিক দেখিয়ে ইউসিবির চট্টগ্রামের চকবাজার শাখা থেকে নেয়া হয় সাড়ে ৯ কোটি টাকার ঋণ। আর দিনমজুর নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী মায়মুনাকে সাজানো হয় ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক। এ প্রতিষ্ঠানের নামে একই শাখা ১৭ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে।
ঋণের নোটিশ পাওয়ার পর পারিবারিক কলহ শুরু হয়। পরিবার জহিরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে। স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় জহিরের। দিনমজুর নুরুল ইসলামের স্ত্রী মায়মুনা মানসিক ভারসাম্যহীন। তাদের তিন সন্তান স্কুলে পড়ে। ‘কোটিপতি’র সন্তান বলে সহপাঠীদের কটাক্ষের কারণে তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীর বড় বিলের বাসিন্দা মিজানুর রহমানের পরিবারের গল্প আরও করুণ। বনের ভেতর একটি ছাপরা ঘরে মিজানের বসবাস। নিজের নামে চট্টগ্রাম বন্দর শাখায় সাড়ে আট কোটি টাকা ঋণের তথ্য জানার পর ২০২৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। এমন তথ্য দিয়ে তার স্ত্রী তসলিমা বেগম বলেন, পাহাড়ের ওপর মাটির ছোট একটি ঘরে তিন সন্তান নিয়ে থাকেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেয়ে-না খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন। আর মৃত স্বামীর ঋণের চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন।
জানা গেছে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক তাদের চট্টগ্রামের চকবাজার শাখা থেকে ৫০ জন দিনমজুরের নামে ৪৪৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। একইভাবে পাহাড়তলী শাখা থেকে ২২ জনের নামে ১৯৫ কোটি, বন্দর শাখা থেকে ১৩ জনের নামে ১৬৬ কোটি এবং বহদ্দারহাট ও খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১৭ জনের নামে ১৫৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটি।
ইউসিবির নথি অনুযায়ী ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে এসব ভুয়া ঋণ দেয়া হয়। ওই সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল ভূমিমন্ত্রী জাবেদের পরিবারের হাতে। মন্ত্রী হওয়ায় তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে না থাকলেও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামান ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান। দুই ভাই ও দুই বোন ছিলেন পরিচালক। এসব ঋণের সুবিধাভোগী হিসেবে জাবেদ পরিবারকে চিহ্নিত করেছে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া এসব অ্যাকাউন্টে ঋণের অর্থ যাওয়ার পর নগদে উত্তোলন করে জাবেদ পরিবারের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা করার পর জাবেদ পরিবারের বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তরের তথ্যও পাওয়া গেছে। প্রতিবছর শাখা থেকে নবায়ন করা হয়েছে, যে কারণে খেলাপি হয়নি।
বিএফআইইউ ইউসিবির চট্টগ্রামের চকবাজার, পাহাড়তলী ও বন্দর শাখার ওপর পরিদর্শন সম্পন্ন করে দুদকে তথ্য দিয়েছে। পরিদর্শন কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শাখায় ভুয়া প্রতিষ্ঠানের প্যাড পেয়েছেন তারা। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃত জাল নথি প্রস্তুত করে এসব ঋণ দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো সদ্য নিবন্ধিত, অভিজ্ঞতাহীন ও নগদ লেনদেনের কোনো বিবরণী না থাকলেও একের এর এক ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। এসব ঋণ ছাড়ের আগে কোনো ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়নি; বরং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ঋণ নেয়া ও পরিশোধের মতো আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এই দিনমজুর, ভ্যানচালক, কৃষকদের নেই। এই ঋণের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। কেবল কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে ঋণ দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে।
দিনমজুররা যেভাবে ঋণের ফাঁদে
যাদের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। তাদের সাহায্য দেয়ার কথা বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এনআইডি সংগ্রহ করেন রামুর ঈদগড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল কালাম। এই কালাম এক যুগ আগে চট্টগ্রামের পটিয়ায় রিকশা চালাতেন। বছর চারেক আগে পটিয়া বাজারের প্রদীপ বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির গোডাউনে কাজ নেন। পটিয়ার মানুষের এনআইডি সংগ্রহ করেন তিনি। নাইক্ষ্যংছড়িতে এনআইডি সংগ্রহে কালামকে সহায়তা করেন তার শ্যালক ও স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল বশর। আর রামুতে সহায়তা করেন স্থানীয় বাজারে দর্জি দোকানের কর্মী মিজানুর রহমান। দুদক কয়েকটি মামলায় এই আবুল কালামকেও আসামি করেছে।
এনআইডি সংগ্রহে সহায়তা করা তিনজনের নামেও ইউসিবি বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। এদের মধ্যে আবুল কালামকে জাহান ট্রেডিংয়ের মালিক সাজিয়ে ব্যাংকের পাহাড়তলী শাখা থেকে দেয়া ঋণ এখন সুদসহ ৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় ঠেকেছে। অর্থ পাচারের ক্ষেত্রেও জাহান ট্রেডিংকে ব্যবহার করা হয়েছে।
নুরুল বশরকে বশর এন্টারপ্রাইজের মালিক সাজিয়ে ব্যাংকটির চকবাজার শাখা থেকে ১৩ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়। এ ছাড়া মিজানুরকে ক্যাটস আই করপোরেশনের মালিক দেখিয়ে বন্দর শাখা থেকে নেয়া হয়েছে ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
আত্মগোপনে থাকা আবুল কালাম টেলিফোনে বলেন, তিনি কোনোভাবেই বুঝতে পারেননি, ঋণের জন্য এনআইডি নেয়া হচ্ছে। সাহায্য দেবে ভেবেই তিনি নিজের আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন ও দরিদ্রদের তালিকা দিয়েছিলেন। এখন তিনি চরম বিপদে আছেন।
তবে এনআইডিগুলো নিয়ে কাকে দিয়েছেন– সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি আবুল কালাম। নুরুল বশর ও মিজানুর রহমান বলেন, সাহায্যের কথা শুনে ঘনিষ্ঠজনদের এনআইডি সংগ্রহ করে দিয়ে এখন বিপদে আছেন। এভাবে যে তারা ঋণের ফাঁদে পড়তে পারেন– বুঝতে পারেননি।
ভুক্তভোগীরা জানান, এনআইডি নেয়ার দুই থেকে তিন মাস পর তাদের আলাদা সময়ে পটিয়ায় ডেকে নেয়া হয়। সেখানকার একটি টং দোকান বা খাবার হোটেলে বসিয়ে কয়েকজন নীল ও সাদা কাগজে টিপসই কিংবা স্বাক্ষর নেন। সই করে বাড়ি ফেরার সময় কারও হাতে ১২ হাজার, কাউকে ১৫ হাজার, কাউকে দুই ধাপে ২৪ হাজার এবং সর্বোচ্চ একজনকে ৩০ হাজার টাকা দেন আবুল কালাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অক্টোবর থেকে তাদের নামে ইউসিবিএল থেকে নোটিশ আসতে শুরু করে। এরপর জানতে পারেন, তাদের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
জহির উদ্দীন ও নূরুল ইসলাম জানান, ঋণের নোটিশ পাওয়ার পর এলাকায় জানাজানি হয়। পরে তারা জানতে পারেন, আবুল কালাম যতজনের এনআইডি নিয়েছে সবার নামে ঋণ হয়েছে। রাজধন কর্মকার, ফরিদুল আলম জানান, সাহায্যের কথা বলে এনআইডি নেয়া হয়। ঋণ বিষয়ে আবেদন তো দূরে থাক, কখনও তারা ব্যাংকেই যাননি।
কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, কালাম এনআইডি নিয়ে পটিয়ার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও প্রদীপ বিশ্বাসের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। প্রদীপ বিশ্বাস জাবেদের ছোট ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনির ঘনিষ্ঠ। আর মোস্তাফিজুর বিঅ্যান্ডবি ইলেকট্রনিকসে কাজ করতেন।
বিঅ্যান্ডবি ইলেকট্রনিকসের মালিক ইউসিবির তখনকার ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদ। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোন আইডির বিপরীতে কোন শাখায় ঋণ হবে, তা ঠিক করে দেন ইউসিবির প্রধান কার্যালয়ের কয়েক কর্মকর্তা ও ব্যাংকটির চকবাজার শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক আব্দুল হামিদ চৌধুরী। সরকার পতনের পর থেকে তারা সবাই পলাতক।
ভুক্তভোগী রাসেল আহমেদ বলেন, ‘আমি একটা মরা মানুষ। দুই টাকা কেউ সাহায্য দিলে হাত পেতে নিই। ঋণ তো দূরে থাক, ওই ব্যাংকে কোনোদিন যাইনি। ২০১৮ সাল থেকে আমি বিছানায়। ডাক্তার বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের জন্য বলে দিয়েছেন। আমার দৈনন্দিন চিকিৎসা খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য নেই। যে কারণে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছি। এখন শুনছি, আমার নামে ঋণ!’ তিনি জানান, বছর চারেক আগে কালাম বাড়িতে এসে একটি কোম্পানি থেকে সাহায্য এনে দেয়ার কথা বলে তার এনআইডি নিয়ে যান।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার দোল্লাই এলাকার বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম থাকেন পটিয়ার বাহুলি এলাকায়। তার নামে শফিকুল ট্রেডার্স নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ইউসিবির পাহাড়তলী শাখা থেকে নেয়া হয়েছে ছয় কোটি ৫৬ লাখ টাকার ঋণ। তিনি জানান, করোনায় সাহায্য দেয়ার কথা বলে এনআইডি নিয়েছিল। পরে ১২ হাজার টাকা করে দুইবারে তাকে ২৪ হাজার টাকা দেয়। তবে ঋণ বিষয়ে কিছু জানতেন না তিনি।
পটিয়ার কিশোর দাশকে শাহচাঁদ আউলিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক সাজিয়ে ব্যাংকের স্টেশন রোড শাখা থেকে আট কোটি টাকার ঋণ হয়। ঋণের নোটিশ পাওয়ার পর থেকে কিশোর দাশ আর বাড়ি আসেননি। তার বাবা বাবুল দাশ বলেন, পরিবারকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ তার ছেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। পরে ঋণ বিষয়ে জানতে পারেন। তার ছেলে এখন সৌদি আরবে।
পটিয়ার বাহুলী এলাকায় নুরুল হাকিম ডাক্তারের বাড়িতে থেকে দিনমজুরের কাজ করেন মুহাম্মদ খান সাহেব। তার নামে ইউসিবির পাহাড়তলী শাখায় ৩ কোটি ৯ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। তিনি বলেন, সাহায্যের কথা বলে তাকে পটিয়া বাজারে নিয়ে যায়। সেখানে কিছু নীল ও সাদা কাগজে টিপসই নিয়ে ফিরে আসার সময় ৩০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন কালাম।
ঋণের টাকা দুবাইয়ে পাচার
দৈবচয়নের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের চকবাজার, পাহাড়তলী ও বন্দর শাখার কয়েকটি ভুয়া ঋণের তথ্য যাচাই করেছে বিএফআইইউ। অর্থের গতিপথ দেখে সংস্থাটি ঋণের সুবিধাভোগী হিসেবে জাবেদ পরিবারকে চিহ্নিত করেছে।
বিএফআইইউ বলেছে, দিনমজুরদের নামে ঋণ সৃষ্টি হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা নগদে তুলে জাবেদের মালিকানাধীন আরামিট সিমেন্ট, আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে। অনেক সময় এসব শাখায় সৃষ্ট ঋণের অর্থ আদনান ইমামের নামে নিবন্ধিত এডব্লিউআর ডেভেলপমেন্ট এবং এডব্লিউআর রিয়েল এস্টেটের কারওয়ান বাজার শাখার অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এর বাইরে কিছু অর্থ জমা করা হয় ইউসিবির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদের মালিকানাধীন আলোক ইন্টারন্যাশনাল, বিঅ্যান্ডবি ইলেকট্রনিক্স এবং এয়ারমেট লাইটিং অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল সল্যুশনের ব্যাংক হিসাবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ উত্তোলন করেন এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সুমন, জাফর, দিদারুল আলম চৌধুরী, বিভাস বোস, তাহিদুল করিম ও মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান।
সৃষ্ট এসব ঋণের টাকা ভুয়া এলসি খুলে দুবাইয়ে পাচারের তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। সংস্থাটি বন্দর, পাহাড়তলী ও চকবাজার শাখার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছে, অধিকাংশ এলসি করা হয়েছে দুবাইয়ে নিবন্ধিত প্যানমার্ক ইমপেক্স মেগা ট্রেডিং এলএলসির নামে। প্রতিষ্ঠানটি ইউসিবির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদের নামে নিবন্ধিত। আবার এখান থেকে এলসির আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানও অস্তিত্বহীন।
বন্দর শাখায় ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদেশি ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ৫৬টি এলসি ইস্যু হয়। যার মূল্য ১৯ লাখ ২৮ হাজার ডলার। প্যানমার্ক ইমপেক্স মেগা ট্রেডিংয়ের নামে খোলা হয় ৩৩টি এলসি, যা ওই শাখার মোট এলসির ৬৬ শতাংশের বেশি। মোট মূল্য ১২ লাখ ৭৪ হাজার ডলার।
পাহাড়তলী শাখায় ২০২১ থেকে ২০২৩ সালে ১৭টি এলসি খোলা হয়। এর মধ্যে ১১টি এলসির আবেদনকারী জাহান ট্রেডিং। বাকি ছয়টি এলসির আবেদনকারী নাজ ইন্টারন্যাশনাল। একই শাখার জাহান ট্রেডিংয়ের নামে ৯ কোটি ৬৫ লাখ এবং নাজ ইন্টারন্যাশনালের নামে ১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। আবার ছয়টি এলসি ইস্যু হয়েছে প্যানমার্কের নামে। এ ছাড়া চকবাজার শাখায় ২০২১ ও ২০২২ সালে চার লাখ ২৮ হাজার ৩১০ ডলার মূল্যের ১৫টি এলসি ইস্যু হয়। এর মধ্যে তিন লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৩ ডলার মূল্যের ৯টি ইস্যু হয়েছে প্যানমার্কের নামে।
বিএফআইইউ এসব এলসির তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেছে, বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের কৌশল হিসেবে এই উপায় ব্যবহার করা হয়। অর্থ পাচারের যথেষ্ট আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদকে প্রতিবেদন দিয়েছে। এ ছাড়া এলসি ইস্যু ও ঋণ দেয়ার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদেশে জাবেদ পরিবারের বিপুল সম্পদ
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ থেকে প্রথমে অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (সিফোরএডিএস) দুবাই ভূমি বিভাগের রেকর্ড ও কিছু ইউটিলিটি কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীর একটি তালিকা তৈরি করে।
২০২০ ও ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা তালিকাটি ২০২৪ সালের মে মাসে অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি) ‘দুবাই আনলকড’ নামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ৪৬১ বাংলাদেশির নামে দুবাইয়ে ৯২৯টি সম্পত্তির তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪২টি সম্পত্তির মালিকানা জাবেদ পরিবারের।
২০২৪ সালের অক্টোবরে সিআইডি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ৪৮ কোটি ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬২০টি বাড়ি কিনেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা পাঁচ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা।
এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৬০টি বাড়ি কিনেছেন তিন হাজার ৮২৪ কোটি টাকায়। আর এক হাজার ২০০ কোটি টাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে ২২৬টি ফ্ল্যাট। আর ৮৩২ কোটি টাকার সমমূল্যে ৩৪টি সম্পদ কিনেছেন যুক্তরাষ্ট্রে।
জাবেদের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে সিআইডি। দেশের বাইরে বিপুল অঙ্কের এসব সম্পদ থাকলেও কখনও নির্বাচনী হলফনামা কিংবা আয়কর নথিতে উল্লেখ করেননি তিনি।
ইউসিবির হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটি থেকে বিভিন্ন বেনামি কোম্পানির নামে ঋণ সৃষ্টি করে অন্তত চার হাজার ২৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন জাবেদ। এই অর্থ উদ্ধারের অংশ হিসেবে গত বছরের ২৯ জুন যুক্তরাজ্যের কাছে ঋণ সমপরিমাণ ৩৫ কোটি ডলার ফেরত চেয়ে চিঠি দেয় ব্যাংকটি। যুক্তরাজ্যে জাবেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়োগ করা প্রশাসক প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ট থর্নটনের কাছে এ অর্থ ফেরত চাওয়া হয়।
ওই সময় ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, যোগসাজশ ও প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন জাবেদ। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিপুল অঙ্কের এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
বিশেষজ্ঞ মত
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, চাইলেই কোনো একক ব্যক্তি এভাবে ঋণ নিতে পারে না। পুরো একটা সিস্টেমকে এখানে যুক্ত হতে হয়েছে। ব্যাংকটিতে একটি পরিচালনা পর্ষদ ছিল। তারা এ দায় এড়াতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন ধরল না– তাও একটা বড় প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, এখানে একটা চক্র কাজ করেছে।
আর যেসব দরিদ্র মানুষকে ফাঁদে ফেলে ঋণের নামে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে তাদের বিষয়ে জাহিদ হোসেনের মত, একটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসব ব্যক্তিদের ঋণের জাল থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
ভিওডি বাংলা/ এমএম







