ওয়াশিংটনে খালেদা জিয়ার স্মরণে আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা

ওয়াশিংটনের শতবর্ষী ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে কূটনীতিক, সাংবাদিক ও নীতি নির্ধারকদের অংশগ্রহণে এক বিশেষ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের সদস্য ও মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় বক্তব্য দেন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত ১১৯তম প্রেসিডেন্ট মার্ক শেফ, এপি’র সাবেক সম্পাদক মেরন বিলকাইন্ড, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা ও মার্শা বার্নিকাট, স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো স্টিভ রোজ, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলার সাবেক প্রধান ইকবাল বাহার চৌধুরী, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মুর্তজা এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এহতেশামুল হক।
স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথপ্রদর্শক। তিনি বলেন, যখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছিল এবং বিরোধী কণ্ঠ রুদ্ধ ছিল, তখনও খালেদা জিয়া নির্ভীকভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানের সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্র সরানোর উদ্যোগে খালেদা জিয়া দৃঢ়ভাবে বাধা দেন এবং স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের অনুমতি ছাড়া অস্ত্র সরাতে দেননি-যা তাঁর সাহসিকতার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। রাষ্ট্রদূত মুশফিক আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করা হয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা বলেন, খালেদা জিয়া ছিলেন অসাধারণ মানবিক ও উদারচিত্তের মানুষ। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি অন্যদের খোঁজখবর নিতেন এবং সবার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ রাখতেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, বহু নির্যাতনের মধ্যেও খালেদা জিয়া কখনো অভিযোগ করেননি। তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল, অতিথিপরায়ণ ও আন্তরিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একজন নারী নেত্রী হিসেবে বাংলাদেশকে যেভাবে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা এশিয়া উপমহাদেশে অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের সভাপতি মার্ক শেফ বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চ্যাম্পিয়নকে স্মরণ করতে পেরে তারা গর্বিত। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।
ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর পরিবার ও দলকে সামলে নিয়ে খালেদা জিয়া রাজনীতির হাল ধরেন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
অধ্যাপক এহতেশামুল হক বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের সীমাহীন ত্যাগ ও বেদনার মধ্যেও খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের লড়াইয়ে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও তাঁকে দমিয়ে রাখা যায়নি।
প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা বলেন, জিয়া পরিবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য জনপ্রিয় অবস্থানে রয়েছে এবং গণতন্ত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
মেরন বিলকাইন্ড বলেন, খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শেখায়-গণতন্ত্র রক্ষা করতে সাহস ও ত্যাগের প্রয়োজন হয়, আর ইতিহাস গড়ে তারাই যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
আলোচনার আগে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যা উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। ওয়াশিংটনের এই স্মরণসভা গণতন্ত্রের প্রতীক এই মহান নেত্রীর প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/ এমএম







