ফেনী
প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানেও থামছে না ফসলি জমির মাটি লুট

ফেনী জেলা জুড়ে ফসলি জমির উপরি ভাগের উর্বর মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়ার ভয়াবহ উৎসব চলছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা ও কারাদণ্ড কার্যকর হলেও কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না প্রভাবশালী মাটি খেকো চক্রকে। ফলে একদিকে যেমন কৃষি জমির উর্বরতা ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফেনী সদর, সোনাগাজী, দাগনভূঞা, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গভীর রাত ও ভোরে ড্রেজার ও এস্কেভেটর (ভেকু) ব্যবহার করে অবাধে মাটি কাটা হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানের খবর পেলেই চক্রটি সাময়িকভাবে গা-ঢাকা দেয়, তবে ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার পরপরই আবার শুরু হয় মাটি লুট।
মাটি ব্যবসায়ীদের প্রভাব ও হুমকির কারণে স্থানীয় কৃষকরাও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পাশের জমির মাটি কেটে নেওয়ায় নিজের জমি ধসে পড়ার আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে অন্য কৃষকরাও মাটি বিক্রি করতে রাজি হচ্ছেন।
কৃষিবিদরা বলছেন, জমির উপরিভাগের মাত্র ৬–১০ ইঞ্চি মাটির মধ্যেই ফসল উৎপাদনের মূল শক্তি নিহিত থাকে। এই অংশ কেটে ফেললে ঐ জমিতে কয়েক বছর ধরে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। মাটির জৈব উপাদান ধ্বংস হয়, সেচের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং গভীর গর্তের কারণে পাশের জমিও ক্ষতির মুখে পড়ে। পাশাপাশি ভারী ড্রাম ট্রাক চলাচলের ফলে গ্রামীণ পাকা রাস্তাগুলো ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষি, পরিবেশ ও জৈব বৈচিত্র ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কাটার বিষয়ে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধনী ২০২৩) অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ আইনের আওতায় জেলাজুড়ে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাগলনাইয়া উপজেলার ঘোপাল ইউনিয়নে ফেনী নদীর বাঁধসহ আশপাশের ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। পরশুরাম উপজেলায় রাতের আঁধারে কহুয়া নদীর বেড়িবাঁধের চরের মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফুলগাজীর দরবারপুর ইউনিয়নের বরইয়া গ্রামে মাটি কাটার খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে একটি এস্কেভেটর জব্দ করে।
সোনাগাজী উপজেলায় সম্প্রতি মুহুরী প্রকল্প সংলগ্ন এলাকায় গভীর রাতে টপ সয়েল কাটার সময় অভিযান চালিয়ে মো. রিপন (২৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইউসুফ মিয়া তাকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই সোনাগাজীতে শুরু হয় ফসলি জমির মাটি কাটার প্রতিযোগিতা, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমিকে পুকুরে রূপান্তর করে দেয়। উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা জুড়েই সক্রিয় রয়েছে অবৈধ মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
এদিকে দাগনভূঞা উপজেলা ফেনীর মাটি খেকোদের অন্যতম হটস্পট হিসেবে পরিচিত।
গত সোমবার রাজাপুর, সিন্দুরপুর ও রামনগর ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে ৪টি ট্রাক্টর জব্দ এবং ২টি এস্কেভেটর অকেজো করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল আলম।
এছাড়া দক্ষিণ আলীপুর, বেতুয়া, সত্যপুর, শ্রীধরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অভিযানে ব্যবহৃত ট্রাক্টর ও এস্কেভেটর জব্দ ও অকেজো করা হয়।
এ বিষয়ে দাগনভূঞা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিদুল আলম বলেন, “কৃষিজমির মাটি কাটা প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে দাগনভূঞায় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ইটভাটা থাকায় একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ পর্যন্ত আমাদের অভিযানে পাঁচজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জনগণ সচেতন না হলে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।”
ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, “ফসলি জমির মাটিকাটা রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়ার পরও এটি পুরোপুরি থামছে না—বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। আমরা শিগগিরই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বসবো। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই সমস্যা সমাধান কঠিন।”
ফেনীর সচেতন মহলের দাবি, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত নয়—মাটি খেকো চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অচিরেই ফেনীর বিস্তীর্ণ ফসলি জমি অনুর্বর মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভিওডি বাংলা/ জহির আদনান/ আ






