সবাইকে নিয়ে নির্বাচন চাই
নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই

নির্বাচন কমিশনের ‘নির্লিপ্ত ও নিশ্চুপ’ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নজরুল ইসলাম খান। বুধবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির নির্বাচনী অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান এই প্রশ্ন তুলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন চাই যথাসময়… ১২ ফেব্রুয়ারিতেই এবং আমরা এটাও চাই যে, সব রাজনৈতিক দল সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। আমাদের কোন কাজে কোন কনফিউশন যাতে না হয় সেজন্য আমাদের চেয়ারম্যান তার উত্তরাঞ্চল সফর স্থগিত করেছেন। আমরা যেখানে নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এত উদ্যোগী সেখানে আমরা তো আশা করতেই পারি যে, অন্য সবাই নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে শান্তি শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনী পরিবেশ অটুট রাখার জন্য কাজ করবেন। দুর্ভাগ্য আমাদের সেটা হচ্ছে না। আপনারা ছবিগুলো(দেখানো আলোকচিত্র) দেখতে পাবেন যে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা পর্যন্ত তারা এমন বক্তব্য রাখছেন, এমন সব ব্যানার নিয়ে কথা বলছেন যেটা স্পষ্টতই নির্বাচনী আচরণ বিধির লঙ্ঘন। আমরা আশা করি নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী কর্মকর্তারা সাধারণ প্রার্থীদের প্রতি যেমন কঠোরআইন পালন করার ব্যাপারে আগ্রহী, সকলের ব্যাপারেই তেমনি আইনানুগ আচরণ করবেন….. আমরা নির্বাচন কমিশনে বলে এসেছি, এখন আপনাদের মাধ্যমে বলছি, নির্বাচন কমিশনের এই নির্লিপ্ততা কিংবা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিশ্চুপতা সুষ্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এটা অনুচিত হলে আমরা মনে করি এবং আমরা আশা করি তারা তাদের আচরণের পরিবর্তন আনবে।”
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, যে তারা নিজের দায়িত্বেই এই কাজগুলি থেকে বিরত থাকবেন।আমরা আশা করব বাংলাদেশে আরো যারা রাজনৈতিক দল আছেন তারাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে কোন বাধার কারণ হবেন না। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী কর্মকর্তাবৃন্দ যার যা দায়িত্ব, যার যা ভূমিকা, যার যার ক্ষমতা সেটা তারা প্রয়োগ করবেন বলে আমরা আশা করি।’
‘সবাইকে নিয়ে নির্বাচন চাই’
তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদেরকে সাক্ষী রেখে বলতে চাই যে, আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা… এর যদি কৃতিত্ব কেউ দাবি করতে পারে সেটা বিএনপি। আমরা একদলীয় সৈন্য শাসনের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি, আমরা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে দেশকে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে পরিণত করেছি, আমরা এক এগারোর সরকারকে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারে বাধ্য করেছি। এবারও প্রায় ১৭/১৮ বছর ধরে আমরা অবিরাম লড়াই করেছি। আমাদের বহু সাথী ঘুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় নির্যাতিত হয়েছেন। আমরা সবাইকে নিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন চাই। সেজন্য আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছি।’
‘আপনাদের মাধ্যমে আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই। যে দেশের মানুষ যারা বহু বছর ভোট দিতে পারে নাই, তার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে নাই, তারা যাতে নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে শান্তি এবং শৃঙ্খলার মধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। এই ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা আমরা পালন করছি, আমরা তাদের সমর্থন চাই আমরা তাদের সহায়তায় সহযোগিতায় আমাদের যে কর্মসূচি সেটা পালনের ইচ্ছা রাখি।’
‘নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই’
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান বলেন, ‘আমরা বারবার বলে এসেছি যে, আমরা নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই… সবার জন্য সমান সুযোগ। দল বড় হোক বা ছোট হোক, ব্যক্তি ক্ষমতাবান হোন বা না হোন, পদবীধারী হোন বা সাধারণ নাগরিক হোন… সবার জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকা দরকার।’
‘নির্বাচন কমিশন বিএনপির বেশ কিছু প্রার্থীকে হয়ত প্রার্থী নির্বাচনী এমনি কোন দোয়া মাহফিল বা কোন অন্য আলোচনা সভায় সেখানে যারা উপস্থিত আছে বক্তব্য রাখে তাদের মধ্যে কেউ কম বোঝে… কোনটা সঠিক কোনটা সঠিক না হয়তো ভালো বুঝতে পারে না…. সেরকম কেউ হয়ত বক্তব্য রেখেছেন যে, ধানের শীষে ভোট দিন… তিনি প্রার্থী না, আমাদের দলের উল্লেখযোগ্য কোন নেতাও না… সেই কারণে তাদেরকে শোক করা হয়েছে। আমাদের একজন প্রার্থীর মেয়ে একটা ফেসবুক চালায়। সেই ফেসবুকে মেয়ে একটা পোস্ট করেছে যেটা নির্বাচনী আইনের লঙ্ঘন। এই কারণে আমাদের প্রার্থী এবং তার মেয়ে দুইজনকে শোকজ করা হয়েছে… আমরা এটা মেনে নেই, মেনে নিতে পারি… যদি আমরা দেখি আর কি যে, সবার জন্য একই আচরণ করছে নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচনী কর্মকর্তারা।’
তিনি বলেন, কিন্তু আপনারা এখানে(সংবাদ সম্মেলনে) কিছু দৃশ্য দেখতে পাবেন যে, অন্য দলগুলির একই আচরণ করছে না। সাধারণ প্রার্থীরা অন্য দলগুলির উল্লেখযোগ্য নেতা, গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এমনকি প্রধান নেতারা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের চোখের সামনে। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
‘অথচ আপনারা জানেন যে, আমাদের নেতা আমাদের দলের চেয়ারম্যান তিনি একটা ব্যক্তিগত সফরে দেশের উত্তরাঞ্চল যেতে চেয়েছিলেন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী যিনি বাংলাদেশের রাজনীতির একজন প্রবাদ পুরুষ, রাজনীতিবিদদেরও নেতা… তার কবর জিয়ারত করা, ২৪‘র ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান শহীদ আবু সাঈদের এবং বিভিন্ন জেলার আরো যেসব শহীদরা শায়িত আছেন তাদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, তার(তারেক রহমান) নানীর কবর জিয়ারত করা, তার নিজের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া এবং তার মা যিনি গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেছেন তার জন্য কিছু দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলেন…. পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল যে এটা কোন নির্বাচনী সফর না রাজনৈতিক সফরও না, তিনি কোথাও কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না, কোথাও কোন নির্বাচনী সমাবেশেও বক্তব্য রাখবেন না। তারপরেও এই নিয়ে কিছু উদ্বেগ কিছু উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে অনেকেই… যার জন্য নির্বাচন কমিশন আমাদের অনুরোধ করেছিল যে আমরা যেন এই সফরটা ২২ তারিখ পর্যন্ত স্থগিত রাখি। আমরা সেটা মেনেছি, আমাদের চেয়ারম্যান সেটা স্থগিত করেছেন।’
‘পোস্টাল ব্যালট প্রসঙ্গে’
ছাপানো পোস্টাল ব্যালটে তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক একেবারে প্রথম দিকে আর বিএনপির প্রতীক ভাঁজে নিচে স্থান পাওয়ার প্রসঙ্গটি তুলে নজরুল ইসলাম খান ‘আপনারা বুঝবেন যে বিষয়টা খুব স্পষ্টতই উদ্দেশ্যমূলক। আমরা এই এটা এটাকে খুবই অন্যায় এবং অনৈতিক মনে করি। আমরা মনে করি যে এটা দ্রুত সংশোধন হওয়া প্রয়োজন, এটা নির্বাচন কমিশনের সংশোধন করা উচিত এবং দরকার হলে আপনারা পুনরায় ছাপেন….এ ব্যাপারে যথেষ্ট সময় আছে।’
‘আমরা এটাও আলোচনা করেছি যে, এই পোস্টাল ব্যালট নিয়ে আরো কিছু ঘটনা ঘটছে। আপনারা কেউ খেয়াল করে থাকতে পারেন যে, বাহরাইনে একজন জামায়েত নেতার বাসায় ২ ‘শও বেশি ব্যালট পেপার নিয়ে কাজ করা ভিডিও… প্রায় সাত মিনিটের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ব্যালট পেপার আপনার একটা আমানত। আমার ব্যালট পেপার আমি ছাড়া আর কেউ দেখার সুযোগ নাই। এটা শুধু উচিত না তা না, এটা বেআইনি। আপনারা জানেন যে ভোট কেন্দ্রে আপনি যে ব্যালট পেপারটা নেন এই ব্যালট পেপার নিয়ে আপনি একটা এনক্লোজারের মধ্যে যান এবং সেখানে আপনি ব্যালট পেপার ভোট দিয়ে আপনি সেখানে বাক্সে ফেলে আসেন। এর মাঝখানে আর কারো এই ব্যালট পেপার দেখার বা আর কারো এই ব্যালট পেপার হাতে নেওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, এক বাড়িতে অনেক ব্যালট পেপার নিয়ে তারা কাজ করছে। তাহলে ব্যালট পেপারের বা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যে ন্যায্য প্রক্রিয়া, যে আইনানুগ প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হলো।’
তিনি বলেন, ‘একই ঘটনা আমরা আজকেও পেয়েছি ওমানের একটা গ্যারেজে গাড়ির উপরে অনেকগুলি ব্যালট পেপার নিয়ে একজন কাজ করছে এবং যিনি করছেন তার নাম হুমায়ুন কবির এবং সেখানকার যারা বসবাস করেন তাদের জানিয়েছেন যে, তিনি জামায়াতের একজন কর্মী….এসব ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গতকালও আমরা আমরা শুধু বাহরাইনটা জানতাম সেটা নিয়ে আমরা নির্বাচন আলোচনা করেছি। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি, যে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা আপনারা নেন।’
‘তারা (ইসি) বলেছেন যে তারা শুনেছেন এবং তারা এম্বাসির মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেখানকার যারা কর্মকর্তা ঐ দেশের তারা বলেছে, যে ইয়েস এরকম একটা ঘটনা… যে রিপোর্ট হয়েছে এটা সত্য। এটা অসত্য বলার কিছু নাই আপনের এই ভিডিওটা দেখলে আপনারা পরিষ্কার বুঝবেন একেবারে চেহারা স্পষ্ট এসছে এবং অসংখ্য ব্যালট পেপার তাদের টেবিলে কেউ এটা হাতে নিয়ে কাজ করতেছেন সবাই দেখতেছে। আমাদের ধারণা এই দুই জায়গায় এটা ধরা পড়েছে কিন্তু এছাড়াও অন্যান্য দেশে এই একই কৌশলে ব্যালট পেপার নিয়ে এই ধরনের ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে বা হতে পারে।’
‘এই ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা একটা সুষ্ঠ নির্বাচন চাই। আমরা চাই, জনগণ এই নির্বাচনে আস্থা রাখুক। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে সেই সরকারও কোনরকম কারসাজি করে ক্ষমতায় এসেছে এমন কোন অভিযোগ না উঠুক। কিন্তু এই যে আপনার এনআইডি কার্ড নিয়ে, বিকাশ নাম্বার নিয়ে, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে ঘটনাগুলি ঘটছে…. এগুলো সবই অনৈতিকভাবে, বেআইনিভাবে নিজেদের পক্ষে অধিক ভোট সংগ্রহের অপচেষ্টা বলে আমরা মনে করি।’
‘আমরা শুধু নিন্দা জানাই না প্রতিবাদ জানাই না। আমরা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের শাস্তি দাবি করছি।আমরা নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছি যে এটা বেআইনি কাজ এবং যারাই বেআইনি কাজ করেছে খুব দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে হয়তো অন্যরা সাবধান হবে। এ ধরনের অপরাধ নাও করতে পারে। তারা বলেছেন তারা এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু আমরা জানি না যে কতটা উদ্যোগ তারা নিবেন এবং কি করবেন তারা। কিন্তু যদি এটা না করা হয় আর যদি অন্যান্য দেশ থেকে এ ধরনের খবর আসতে থাকে তাহলে এই পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচনের বিষয়টি প্রশ্নবোধক হয়ে যাবে। যেটা কোন মতেই প্রত্যাশিত হয়নি।’
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিহউল্লাহসহ অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
ভিওডি বাংলা/ এমএম







