কেরানীগঞ্জে নিখোঁজের ২১ দিন পর মা-মেয়ের মরদেহ উদ্ধার

ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিখোঁজের প্রায় ২১ দিন পর এক মা ও তার স্কুলপড়ুয়া মেয়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে কেরানীগঞ্জের কালিন্দী ডায়াবেটিস বাজার এলাকার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন রোকেয়া রহমান (৩২) ও তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমা। ফাতেমা স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। পুলিশ জানায়, ফ্ল্যাটের খাটের নিচে ও বাথরুমের ছাদের অংশ থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মরদেহের অবস্থা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি বেশ কয়েকদিন আগেই সংঘটিত হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা ওই এলাকার একটি বাড়িতে গৃহশিক্ষিকার কাছে পড়তে যায়। নির্ধারিত সময় পার হলেও সে বাসায় না ফেরায় তাকে খুঁজতে বের হন তার মা রোকেয়া রহমান। এরপর থেকেই মা ও মেয়ে দুজনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাদের সন্ধান পাননি।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়ার পরপরই তারা বিষয়টি পুলিশকে জানালেও কার্যকর কোনো সহযোগিতা পাননি। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, একাধিকবার থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে চাইলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। বরং বিষয়টিকে পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
নিহত রোকেয়া রহমানের স্বামী শাহীন আহমেদ বলেন, “স্ত্রী ও মেয়েকে খুঁজতে আমি বহুবার ওই বাড়িতে গিয়েছি, কিন্তু বাড়ির মালিক বা সংশ্লিষ্ট কেউই সহযোগিতা করেনি। থানায় গেলে পুলিশ বলেছে, পারিবারিক সমস্যার কারণে হয়তো তারা কোথাও চলে গেছে। গত ২১ দিনে শতাধিকবার থানায় গিয়েছি, কিন্তু কোনো সুবিচার পাইনি।”
নিখোঁজের প্রায় তিন সপ্তাহ পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে ভবনের মালিক পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, শুরুতেই যদি নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হতো, তাহলে হয়তো এই নির্মম পরিণতি এড়ানো যেত।
তবে পুলিশ দাবি করেছে, অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তারা নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছিল। কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম বলেন, “প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি, তবে সন্দেহভাজনদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।”
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গৃহশিক্ষিকাসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রনি চৌধুরী বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, নিহত ফাতেমা একটি ঘর থেকে বের হচ্ছে। তবে এরপর সে কোন দিকে গেছে, তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া রোকেয়া রহমানকে গৃহশিক্ষিকার অন্য একটি ভাড়া বাসা থেকে বের হতে দেখা গেছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।”
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ও সময় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
নিরাপদ ভেবে যে বাড়িতে সন্তানকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন একজন মা, সেখানেই এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকাবাসী গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, মা-মেয়ের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা ফেরাতে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।
ভিওডি বাংলা/জা







