দেশজুড়ে শক:
মা-মেয়েকে হত্যা করে ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস

ঢাকার কেরানীগঞ্জে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। মা-মেয়েকে হত্যা করার পর ২১ দিন পর্যন্ত লাশের সঙ্গে বসবাস করছিলেন হত্যাকারী ও তার পরিবার।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাতের সময় কেরানীগঞ্জের কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকায় নুসরাত মীম নামে এক শিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে নিহত স্কুলছাত্রী জোবাইদা রহমান ফাতেমা (১৪) ও তার মা রোকেয়া রহমানের (৩২) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার পর পুলিশ নুসরাত মীম (২৪), তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮) এবং নুসরাতের ১৫ ও ১১ বছর বয়সী দুই বোনকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুসরাত মীম নিজেই হত্যাকাণ্ডের ভীতিকর সত্য স্বীকার করেছেন। তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ২১ দিন ধরে লাশের সঙ্গে বাস করছিলেন অভিযুক্তরা, যা পুরো বিষয়টিকে আরও লোমহর্ষক করেছে।
নিহত জোবাইদা ও রোকেয়া ২৫ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। রোকেয়ার স্বামী শাহীন আহম্মেদ কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ৬ জানুয়ারি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় অপহরণের মামলা দায়ের করেন।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম জানান, নুসরাত মীম একটি এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণের জামিনদার ছিলেন তার শিক্ষার্থী জোবাইদার মা রোকেয়া। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল এনজিও কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে নুসরাত ও রোকেয়ার মধ্যে মনোমালিন্য ও কথাকাটাকাটির ঘটনা ঘটে।
২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে নুসরাতের ফ্ল্যাটে গেলে নুসরাতের ছোট বোনের (১৫) সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ফাতেমাকে গলা চেপে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনার আড়াল করতে, ফাতেমার পোশাক পরে তার বোন ফ্ল্যাট থেকে বের হয়, যেন সিসিটিভি ফুটেজে মনে হয় ফাতেমা নিজেই চলে গেছে।
পরবর্তীতে রোকেয়াকে নুসরাত ফোন করে মেয়ের অসুস্থতার কথা বলে ফ্ল্যাটে ডেকে আনে। এরপর নুসরাত পেছন থেকে ওড়না পেঁচিয়ে রোকেয়ার গলা চেপে ধরেন এবং ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। দুই বোন মিলে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।
ওসি সাইফুল আলম জানান, হত্যাকাণ্ডের পর ফাতেমার লাশ শৌচাগারের ফলস সিলিংয়ের ভেতর এবং রোকেয়ার লাশ নুসরাতের শোবার ঘরের বক্স খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। লাশের উপস্থিতিতে অভিযুক্তরা প্রায় ২১ দিন ফ্ল্যাটে বসবাস করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুসরাত মীম ও তার ছোট বোন হত্যাকাণ্ডে সম্পূর্ণভাবে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। নুসরাতের ছোট বোন নাবালিকা হওয়ায় তাকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ আরও জানায়, এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
এর আগে নিহত জোবাইদা ফাতেমা স্থানীয় একটি স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। তার মা রোকেয়া রহমান স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নুসরাত মীম ও তার পরিবার সাধারণত শান্ত স্বভাবের হলেও ঋণ সংক্রান্ত চাপ ও মনোমালিন্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় কেরানীগঞ্জে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা ও শিক্ষার্থীরা এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। পুলিশ নিশ্চিত করেছেন, মামলা দ্রুত বিচারসহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে।
দেশজুড়ে এই ঘটনা সামাজিক ও নৈতিক সচেতনতার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুলিশ বলছে, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুনরায় ঘটতে না দেওয়ার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভিওডি বাংলা/জা







