চীনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা কানাডার

চীনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ট্রাম্প প্রশাসনকে কড়া এক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা দিয়েছে কানাডা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার এই উদ্যোগকে উত্তর আমেরিকার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চীনের সঙ্গে নতুন চুক্তির আওতায় কানাডা চীনা বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ওপর শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বিনিময়ে চীন কানাডার কৃষিপণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক হ্রাস করবে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুক্রবার এক বক্তব্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, “বিশ্ব বদলে গেছে। নতুন এই চুক্তি পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় কানাডাকে শক্ত অবস্থানে রাখবে।” তিনি আরও বলেন, এই সমঝোতা কানাডার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্ক কার্নি জানান, বেইজিংয়ের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক এখন ‘কৌশলগত ও বাস্তবভিত্তিক’। তার ভাষায়, “চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা হচ্ছে দৃঢ়ভাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ওয়াশিংটনের তুলনায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।”
নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কানাডা বছরে নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক কমাবে। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার চীনা ইভি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই কোটা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এর বিনিময়ে চীন কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য-বিশেষ করে ক্যানোলা-এর ওপর আরোপিত শুল্ক কমাবে। পাশাপাশি সামুদ্রিক খাদ্যসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। একইসঙ্গে কানাডীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে এবং কানাডার অটোমোবাইল শিল্পে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে অটোয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে কানাডার বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর অংশীদারত্ব প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে টেসলার মতো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
তবে এই চুক্তি নিয়ে কানাডার অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড এই চুক্তির সমালোচনা করে বলেন, এতে দেশীয় উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে সাসকাচুয়ান প্রদেশের প্রিমিয়ার স্কট মো মনে করেন, চীনের শুল্ক কমানোর ফলে ক্যানোলা কৃষকরা বড় ধরনের সুবিধা পাবেন।
এই চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও বিভক্ত। হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিটিকে ‘সমস্যাজনক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে তুলনামূলক ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডা ও চীনের মধ্যে এই নতুন চুক্তি উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামোতে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে কানাডার বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যকার ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তি দুর্বল করার হুমকিও দিয়েছে।
অটোয়ার কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এখন এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকা আর সম্ভব নয়। ফলে বাণিজ্য অংশীদারদের বৈচিত্র্য বাড়ানোই কানাডার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
ভিওডি বাংলা/জা







