• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

দেশীয় কটন সুতা শিল্প সুরক্ষায় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২৩ পি.এম.
ছবি-ভিওডি বাংলা

দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে কটন সুতা আমদানিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বন্ড সুবিধা বাতিল বা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়।

রোববার (১৮ জানুয়ারি) এনবিআরের কাস্টমস নীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশীয় শিল্প সুরক্ষার স্বার্থে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা সীমিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো চিঠির সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ৬ জানুয়ারি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিকে বন্ড সুবিধার আওতার বাইরে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে দেশীয় সুতা উৎপাদন শিল্পের ওপর চলমান চাপ অনেকাংশে কমবে।

রপ্তানি খাত ও বন্ড সুবিধার পটভূমি

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানি আয় আসে নিট গার্মেন্টস খাত থেকে। রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে আশির দশক থেকে সরকার তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে।

নিট গার্মেন্টস শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সুতা। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা কার্যকর রয়েছে। তবে রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত দুই দশকে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে সুতা ও কাপড় উৎপাদন শিল্পে শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। এর ফলে দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এবং আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমেছে।

দেশীয় শিল্প সক্ষম হলেও সংকটে

বর্তমানে দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কটন সুতা ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন সরবরাহের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক চাহিদার বড় অংশ পূরণে সক্ষম। নিট গার্মেন্টস খাতেও দেশীয় সুতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সহায়ক শিল্পনীতির কারণে দেশীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, পার্শ্ববর্তী দেশে ৩০ কাউন্ট কটন সুতার প্রতি কেজির ন্যূনতম মূল্য প্রায় ২.৯৩ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের উৎপাদন খরচের কাছাকাছি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সুতা বিক্রয় মূল্য গড়ে ২.৮৫ মার্কিন ডলার। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তাদের শিল্পকে সহায়তা দিতে কম দামে জমি বরাদ্দ, বিক্রয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি, দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সহায়তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সুবিধা দিচ্ছে।

অন্য দেশের প্রণোদনায় অসম প্রতিযোগিতা

এসব সহায়ক নীতির ফলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সুতা উৎপাদকরা প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০ সেন্ট সমপরিমাণ সরকারি সহায়তা পাচ্ছে। এতে করে তারা উৎপাদন খরচের তুলনায় ৩০ থেকে ৩৮ সেন্ট কম দামে, অর্থাৎ গড়ে ২.৫০ থেকে ২.৬০ মার্কিন ডলারে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করতে পারছে।

দেশীয় উৎপাদকরা উৎপাদন দক্ষতা বাড়িয়ে খরচ কমানোর চেষ্টা করলেও প্রণোদনাপ্রাপ্ত এই কম মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা ক্রমেই আর্থিক সংকটে পড়ছেন এবং তাদের বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ছে।

বন্ড সুবিধায় আমদানি বেড়ে যাওয়ার প্রভাব

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত দুই অর্থবছরে বন্ড সুবিধার আওতায় কটন সুতার আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশীয় উৎপাদিত সুতার বিক্রয়ের ওপর।

বর্তমানে অধিকাংশ সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে দেশে প্রায় ৫০টি বড় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আমদানির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির আশঙ্কা

উদ্যোক্তাদের মতে, কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নিট গার্মেন্টস শিল্প দেশীয় সুতার পরিবর্তে আমদানিকৃত সুতার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

এতে করে দেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাবে, লিড টাইম বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্য সংযোজন কমে যাবে। পাশাপাশি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।

বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ

এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জরুরি ভিত্তিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিকে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে আমদানি বিল অব এন্ট্রিতে কটন সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ নিশ্চিত করতে কাস্টম হাউসগুলোকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের মতে, এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে একদিকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে গার্মেন্টস শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ভিওডি বাংলা/জা

 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ভবিষ্যৎ অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি গড়ছে অন্তর্বর্তী সরকার: আশিক মাহমুদ
ভবিষ্যৎ অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি গড়ছে অন্তর্বর্তী সরকার: আশিক মাহমুদ
জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনে রেমিট্যান্স ১.১২ বিলিয়ন ডলার
জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনে রেমিট্যান্স ১.১২ বিলিয়ন ডলার
১০২ হতদরিদ্রের নামে ৯৬৩ কোটি টাকার ঋণ
১০২ হতদরিদ্রের নামে ৯৬৩ কোটি টাকার ঋণ