ভারতনির্ভরতা কমানোর মধ্যেই আমদানি বেড়েছে সর্বোচ্চ

অভ্যুত্থানের পর ২০২৪-এ জুলাই মাসে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে অবস্থান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর তিনদিন পর ৫ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের কারণে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। একই সঙ্গে ভারতনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়, যা ড. ইউনূসসহ তার সরকারের নীতি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য উপদেষ্টা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর জানিয়েছিলেন, ভারত ছাড়াও মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে। সেই সময়ে আলু ও পেঁয়াজ আমদানিতেও বিকল্প উৎস খোঁজার কথা জানিয়েছিল ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। ভারত থেকে স্থলবন্দর মাধ্যমে সুতা আমদানি বন্ধ করা হয় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে।
এছাড়া ভারত থেকে নিউজপ্রিন্ট, গুঁড়া দুধ, সাইকেল, মোটর পার্টস, সিরামিকওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার ও টাইলসের মতো পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এনবিআর দ্বারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাকও তীব্র হয়।
কিন্তু, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হয়নি। বরং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ভারতের আমদানি ব্যয় সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ৭.৮৩%। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের সঙ্গে সরকারি ক্রয় চুক্তি এই প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব রেখেছে।
২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর সুযোগ বাতিল করে। ১৫ এপ্রিল এনবিআর ঘোষণা দেয় ভারত থেকে সুইং সুতা ও কাঁচামাল স্থলবন্দর মাধ্যমে আমদানি বন্ধের। এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে উত্তেজিত করে। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে সেফগার্ড ডিউটি আরোপের বিষয়েও আলোচনার সূচনা হয়।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রফতানিমুখী উৎপাদন এবং ভোক্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমদানি করতে হয়। অর্থমূল্য বিবেচনায় চীন বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস ভারত। এই দুই দেশ থেকে মোট আমদানির ৪৪% হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকাই-দিল্লির মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। সীমান্তে উত্তেজনা, কূটনৈতিক ভাষার কঠোরতা, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিতকরণ এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে সমস্যা দেখা দেয়। ২০২৫ সালে ভারত থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল, স্থলবন্দর ভিত্তিক আমদানি-রফতানি সীমাবদ্ধকরণ এবং কাঁচা পাট ও সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধের মতো ঘটনা ঘটেছে।
তবে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি ২.৪৪% হলেও ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে ৭.৮৩%।
দেশভিত্তিক আমদানিতে চীন এখনও শীর্ষে, যা মোট আমদানির ৩০.০২%। ভারতের অংশ ১৪.১৮% এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ৩.৬৭%। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১,৯০৪.৯০ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২,০৫২.২০ কোটি ডলার হয়েছে (৭.৭৩% বৃদ্ধি)। ভারতের ক্ষেত্রে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৯৮.৯০ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫-এ বেড়ে হয়েছে ৯৬৯.৩০ কোটি ডলার (৭.৮৩% বৃদ্ধি)।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে বিপরীত প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮৮.৩০ কোটি ডলার পণ্য আমদানি হলেও ২০২৪-২৫-এ কমে ২৫০.৬০ কোটি ডলার হয়েছে (১৩.০৭% হ্রাস)। মালয়েশিয়া ও তাইওয়ান থেকেও আমদানির পরিমাণ কমেছে যথাক্রমে ১৪.১৮% ও ৮.০১%।
বাংলাদেশের সব খাত-তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণ ও ভোক্তা বাজার-কোন না কোনভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্থানীয় শিল্পে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য গত পাঁচ দশক ধরে বাড়ছে। দুই দেশের মোট বাণিজ্যের ৮৫% ভারত থেকে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি মূলত বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপথেই ঘটেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহুস্তরীয় আন্তঃনির্ভরতা রয়েছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামোয় টেনশন থাকলেও অর্থনৈতিক ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ অব্যাহত। তাই ভারতের আমদানি ব্যয়ে বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিরোধ অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে।’
ভিওডি বাংলা/জা







