মিথ্যা বলার অভ্যাস ছাড়বেন যেভাবে

মানুষ হিসেবে আমরা কেউই নিজেদের ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। তবুও বাস্তব জীবনের নানা পরিস্থিতিতে আমরা অনেক সময় ছোট-বড় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ফেলি। কখনো অন্যকে খুশি করতে, কখনো নিজের ভুল ঢাকতে, আবার কখনো অপ্রয়োজনীয় ভয় বা চাপ থেকে বাঁচতেই এই অভ্যাস গড়ে ওঠে। শুরুতে নিরীহ মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা বলার প্রবণতা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত মিথ্যা বলা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী-সব ক্ষেত্রেই এতে আস্থার সংকট তৈরি হয়। তবে আশার কথা হলো, সদিচ্ছা ও সচেতন প্রচেষ্টা থাকলে এই ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
যেকোনো অভ্যাস পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো সেই অভ্যাসের পেছনের কারণ বা ‘ট্রিগার’ শনাক্ত করা। মিথ্যা বলার মুহূর্তে নিজেকে থামিয়ে প্রশ্ন করা প্রয়োজন-আমি কেন সত্য গোপন করছি? ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ নাকি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা কি এর পেছনে কাজ করছে? নিজের আবেগ ও মানসিক অবস্থার প্রতি মনোযোগী হলে মিথ্যার উৎস চিহ্নিত করা সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় আমরা সরাসরি ‘না’ বলতে না পারার কারণে মিথ্যার আশ্রয় নিই। কারও অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে অস্বস্তি হলে আমরা অজুহাত দাঁড় করাই কিংবা তথ্য বিকৃত করি। অথচ নিজের সীমাবদ্ধতা বা অপারগতা সম্পর্কে স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে কথা বলতে শিখলে মিথ্যার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যায়। কোনো বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হলে তা শান্তভাবে জানানোই সবচেয়ে সৎ পথ।
অনেক মানুষ সত্য বলার সম্ভাব্য পরিণাম নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পান। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্যের ফলাফল আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক হয়। সাময়িকভাবে কেউ কষ্ট পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সততা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বাড়ায়। তাই একেবারে বড় পরিবর্তনের চেষ্টা না করে ছোট ছোট সত্য বলার অভ্যাস দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
যেকোনো কথা বলার আগে নিজের অন্তর্দৃষ্টি বা ‘গাট ফিলিংস’ যাচাই করা জরুরি। কথাটি কি অন্যের প্রতি সম্মানজনক? এতে অপ্রয়োজনীয় আঘাত লাগছে কি না-এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করলে অনেক সময়ই মিথ্যা বলার প্রবণতা থেকে সরে আসা সম্ভব হয়।
মিথ্যা ত্যাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস্তবতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা। নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখা এবং তথাকথিত ‘সাদা মিথ্যা’ দিয়ে বিষয়টিকে জায়েজ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। সত্য স্বীকার করা প্রথমে কষ্টকর মনে হলেও এটি মানসিক শান্তি এনে দেয় এবং আত্মসম্মান বৃদ্ধি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার প্রবণতা আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এমন অবস্থায় দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শৈশবের কোনো ট্রমা, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ বা আত্মমূল্যবোধের অভাব থেকেও এই অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে, যা সঠিক থেরাপির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
দিনশেষে সততা বজায় রাখা কোনো একদিনের সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সততা জীবনের অংশ হয়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদে তা বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়, সম্পর্ককে মজবুত করে এবং মানুষকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করে তোলে।
সূত্র: হেলথ লাইন
ভিওডি বাংলা/জা







