রাজশাহীতে কুয়াশায় বোরো বীজতলা নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

তীব্র শীত ও একটানা ঘন কুয়াশায় রাজশাহীতে বোরো ধানের বীজতলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সপ্তাহজুড়ে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বোরো বীজতলা ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছে। কোথাও চারা হলদে হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার লালচে রং ধারণ করে ঝলসে পড়ছে। অনেক বীজতলায় চারার বৃদ্ধি থেমে গেছে, দেখা দিয়েছে শীতজনিত রোগের লক্ষণ। এতে আসন্ন বোরো মৌসুমে আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শীতের দাপট থেকে বীজতলা রক্ষায় কৃষকরা রাতভর পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখছেন। দিনের বেলা সূর্যের আলো পেলেই সেই পলিথিন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যাদের পলিথিন জোগাড় করা সম্ভব হয়নি, তারা পাতলা খড় কিংবা শুকনো ঘাস দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখছেন। তবে টানা ঘন কুয়াশা ও পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
মোহনপুর ও পবা উপজেলার দারুশা, দুয়ারী, বিদিরপুর, মহানন্দাখালী, বড়গাছি ও পারিলা এবং গোদাগাড়ীর কাকনহাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বোরো বীজতলাই শীতের ধকল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক জায়গায় বীজতলার চারা হলদে ও লালচে হয়ে গেছে, কোথাও পাতার আগা পুড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামের কৃষক সামসুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ব্রি-২৯ জাতের এক মন ধানের বীজতলা করেছি। কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো সূর্যের আলো পাচ্ছে না। ঘন কুয়াশা আর তীব্র ঠান্ডার কারণে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। কৃষি অফিসের পরামর্শে রাতে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখছি, দিনে খুলে দিচ্ছি। তারপরও কিছু চারা নষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে আবার নতুন করে বীজতলা করতে হয়েছে। বোরো আবাদ না হলে আমাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
একই চিত্র মোহনপুর উপজেলার দুয়ারী গ্রামেও। ওই গ্রামের কৃষক সাহাদাৎ হোসেন জানান, ব্রি-২৮ ও রত্নামালা জাতের আধা মন ধানের বীজতলার প্রায় অর্ধেকই শীত ও কুয়াশার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চারাগুলো হলদে হয়ে যাচ্ছে, কোথাও লালচে রং ধরেছে। এত কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করেছি, এখন সব নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করছে।’
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি শীত মৌসুমে জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কয়েক দিন ধরে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে ঘন কুয়াশা থাকায় জনজীবন ও প্রাণিকূলের পাশাপাশি কৃষি খাতেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সূর্যের আলো না থাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে অবস্থান করছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, কুয়াশা ও তীব্র শীতের সময়ে বোরো বীজতলায় ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম থিওভিট বা কম্যুলাস জাতীয় প্রতিষেধক মিশিয়ে স্প্রে করলে শীতজনিত ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে বোরো চারায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ দেখা দেয়। এতে চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, অনেক ক্ষেত্রে চারা ঝলসে যায় কিংবা মরে যায়। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই কৃষকদের রাতে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা এবং দিনে সময়মতো খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, বীজতলায় সব সময় নলকূপ বা মাটির নিচ থেকে তোলা পানি ব্যবহার করতে হবে। পুকুরের পানি অত্যন্ত ঠান্ডা হওয়ায় তা ব্যবহার করলে চারার ক্ষতি বাড়তে পারে। শীতকালে সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, প্রচণ্ড শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে শীতকালীন শাকসবজি ও বোরো বীজতলা ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। শৈত্যপ্রবাহ কিছুটা কেটে গিয়ে সূর্যের আলো দেখা দিতে শুরু করায় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে।
তিনি বলেন, বোরো চারা রক্ষা ও পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। সঠিক ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
ভিওডি বাংলা/ মোঃ রমজান আলী/ আ







