• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

বিএনপির প্রত্যাবর্তন নাকি জামায়াতের উত্থান?

ভিওডি বাংলা ডেস্ক    ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩১ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশে প্রথম নির্বাচন।

গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে এই নির্বাচনে দলটির অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এতে এই নির্বাচন মূলত একটি দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। এর এক দিকে আছে বিএনপি আর অন্য দিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় জোট। এই জোটে যোগ দিয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল এনসিপিসহ বেশ কয়েকটি ইসলামপন্থী দল।

সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থনের ব্যবধান দ্রুত কমতে দেখা যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) এক জরিপে দেখা যায়, বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ, আর জামায়াতের ২৯ শতাংশ। গত সপ্তাহে জরিপ চালিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি ও জাগরণ ফাউন্ডেশনসহ বেশ কয়েকটি গবেষণা সংস্থা। এতে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির সমর্থন ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সামান্য পিছিয়ে জামায়াত।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নাটকীয় উত্থান। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে জামায়াত কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দলটির শীর্ষ নেতাদের হয় ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, নয়তো কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দলটির দাবি, এ সময়ে তাদের হাজার হাজার কর্মী গুম হয়েছেন কিংবা হেফাজতে নিহত হয়েছেন।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য শেখ হাসিনা যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই আদালতের কাঠগড়াতেই তোলা হয়েছে তাঁকে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক অনুরোধেও তাঁকে প্রত্যর্পণে ভারত রাজি হয়নি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। এ নিয়ে এখনো বাংলাদেশের বহু মানুষের দলটির প্রতি ক্ষোভ আছে। অবশ্য জামায়াতের দাবি, মুক্তিযুদ্ধে তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও কোনো গণহত্যায় জড়িত ছিল না। বাংলাদেশের প্রচলিত ইতিহাস বলছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে এমনকি আধা সামরিক বাহিনী গঠন করে, যারা স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে।

ফরিদপুরের একজন ব্যাংকার, যিনি জামায়াতকে সমর্থন করেন ও দলটির পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন, তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার শাসনামলে আমাদের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমাদের অনেক নেতা ফাঁসিতে ঝুলেছেন। জামায়াত ও শিবিরের কর্মীরা নিহত হয়েছেন, আমাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মানুষ আমাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা আমাদের সৎ হিসেবে দেখে। এ কারণেই তারা আমাদের ভোট দেবে।’

১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদীর হাত ধরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠা হয়। শুরুতে এটি ছিল একটি আন্তআঞ্চলিক ইসলামপন্থী আন্দোলন, পরে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ১৯৭২ সালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে। তবে ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। পরবর্তী দুই দশকে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকারে আসে বিএনপি। সেবারই খালেদা জিয়া প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর শাসনামলেই জামায়াতের শীর্ষ নেতা গোলাম আযম নাগরিকত্ব ফিরে পান। ২০০১ সালে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়ে মন্ত্রিসভায় দুটি পদ পায়।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফিরলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেন। দলটির সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ একাধিক নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এতে গত ১৫ বছর রাজনীতিতে দলটি অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় ছিল।

গণ-অভ্যুত্থানের পর শফিকুর রহমান, সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে জামায়াত বেশ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আসন্ন নির্বাচনে দলটিকে বিএনপি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই বিবেচনা করছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যও সেই গতি আরও বাড়িয়েছে।

দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আল জাজিরাকে বলেন, ‘গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশ মূলত দুটি দল দ্বারা শাসিত হয়েছে—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। মানুষ এই দুই দলকে দীর্ঘদিন ধরে দেখেছে। তারা হতাশ। তারা নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তি চায়।’

তাহের জানান, জামায়াতের আনুমানিক দুই কোটি সমর্থক রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ নিবন্ধিত সদস্য। এদের বলা হয় ‘রুকন’, যার মধ্যে নারী সদস্যও আছেন। এই সাংগঠনিক শক্তিকেই আসন্ন নির্বাচনে কাজে লাগাতে চায় নবীন দল এনসিপি। তাহের বলেন, ‘জামায়াতের প্রতি জনআগ্রহ বাড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারি।’

জামায়াতের উত্থানে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে, বাংলাদেশ কি ইসলামপন্থী সরকারের জন্য প্রস্তুত? বিষয়টি নিয়ে মতদ্বৈধতা আছে। অনেকের আশঙ্কা, তারা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে পারে বা নারীর অধিকার সীমিত করবে। তবে জামায়াত নেতারা এসব আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। নেতারা বলছেন, তাঁরা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় থেকেই সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন।

জামায়াত নেতা তাহের বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে সম্মত সংস্কার বাস্তবায়ন করব। সুশাসন ও দুর্নীতি দমনের মতো প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।’ তাহেরের দাবি, জামায়াত ‘রক্ষণশীল’ নয় বরং একটি ‘মধ্যপন্থী ইসলামপন্থী শক্তি’। তিনি বলেন, ‘এনসিপি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে জোট গঠন ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের চেতনার সমন্বয়—যা আদর্শিক কঠোরতার চেয়ে প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতিফলন।’

এবারই প্রথম একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। এর মাধ্যমে অমুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চাইছে দলটি, যারা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ।

বাংলাদেশের এই নির্বাচন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা বিএনপির তুলনায় কঠিন হবে। সেই তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা হয়তো গতি পাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও পরিবহন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ভিওডি বাংলা/ এমএইচ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
তারেক রহমানের পক্ষে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ
ঢাকা-১৭: তারেক রহমানের পক্ষে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ
নাভিদ-তৌহিদের নেতৃত্বে এনপিএ'র আহ্বায়ক কমিটি গঠন
নাভিদ-তৌহিদের নেতৃত্বে এনপিএ'র আহ্বায়ক কমিটি গঠন
বিএনপি জোট ছাড়ল মান্নার নাগরিক ঐক্য
একক নির্বাচনের ঘোষণা বিএনপি জোট ছাড়ল মান্নার নাগরিক ঐক্য