ভাইবোনের উপহার করমুক্ত, শ্বশুরবাড়ির উপহারে কর বাধ্যতামূলক

উপহার পাওয়া আনন্দের হলেও সব ধরনের উপহার এখন আর করমুক্ত থাকছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক সংশোধিত আয়কর বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকটি পারিবারিক সম্পর্ক ছাড়া অন্য যেকোনো উৎস থেকে পাওয়া উপহার এখন করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, গয়না কিংবা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর গ্রহীতাকে আয়কর পরিশোধ করতে হবে।
এনবিআরের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বর্তমানে কেবল চারটি পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উপহার করমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে। এই সম্পর্কগুলো হলো-স্বামী-স্ত্রী, মাতা-পিতা, ছেলে-মেয়ে এবং আপন ভাই-বোন। এসব ক্ষেত্রে উপহার গ্রহণ বা প্রদান করলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই করের দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি অর্থবছর থেকেই ‘আপন ভাই-বোন’ সম্পর্কটি করমুক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ভাই-বোনের মধ্যে অর্থ বা সম্পদ লেনদেন করমুক্ত হিসেবে গণ্য হতো না। নতুন এই সিদ্ধান্তে বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বহু প্রবাসী নিয়মিতভাবে তাঁদের ভাই বা বোনের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন কিংবা মূল্যবান সামগ্রী উপহার দেন।
তবে এ ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত আরোপ করেছে এনবিআর। পাঁচ লাখ টাকার বেশি যেকোনো আর্থিক লেনদেন অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। নগদ লেনদেন হলে সেটি সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং প্রয়োজনে কর কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা চাইতে পারে।
অন্যদিকে, করমুক্ত তালিকার বাইরে থাকা সম্পর্কগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা, ননদ-দেবরসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব। এসব উৎস থেকে পাওয়া যেকোনো অর্থ, জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি বা মূল্যবান সামগ্রী এখন করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি তাঁর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে জমি বা ফ্ল্যাট উপহার হিসেবে পান, তবে সেই সম্পদের বাজারমূল্য অনুযায়ী তাঁকে আয়কর রিটার্নে তা দেখাতে হবে এবং প্রযোজ্য হারে কর পরিশোধ করতে হবে। একইভাবে বড় অংকের অর্থ উপহার হিসেবে গ্রহণ করলেও সেটি আয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, অতীতে অনেক করদাতা তাঁদের আয়ের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া উপহারের কথা উল্লেখ করতেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যেত, দাতা পক্ষ তাঁদের নিজস্ব আয়কর রিটার্নে ওই দানের তথ্য উল্লেখ করতেন না। এতে করে উপহারের নামে অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগ তৈরি হতো। এই ধরনের অনিয়ম বন্ধ করতেই উপহারের সংজ্ঞা ও করযোগ্যতার বিষয়টি আরও কঠোর ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, উপহার লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দাতা ও গ্রহীতা-উভয়কেই তাঁদের নিজ নিজ আয়কর রিটার্নে এই লেনদেনের তথ্য উল্লেখ করতে হবে। যেমন, কেউ যদি তাঁর আপন ভাইয়ের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা উপহার পান, তাহলে গ্রহীতাকে তাঁর রিটার্নে সেটি ‘উপহার’ হিসেবে দেখাতে হবে এবং দাতা ভাইকেও একই পরিমাণ অর্থ ‘দান’ হিসেবে তাঁর রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি এই তথ্য মিল না থাকে বা কোনো পক্ষ তথ্য গোপন করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সম্পদকে করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করা হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কর, জরিমানা কিংবা আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিধান কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনবে এবং উপহারের নামে কালোটাকা সাদা করার প্রবণতা কমাবে। তবে সাধারণ করদাতাদের জন্য বিষয়টি কিছুটা জটিল হতে পারে। তাই উপহার গ্রহণ বা প্রদানের আগে সম্পর্কের ধরন, লেনদেনের পরিমাণ এবং মাধ্যম সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে, এনবিআরের নতুন এই বিধান কর নীতিকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করার একটি পদক্ষেপ। এখন থেকে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি কর আইনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিওডি বাংলা/জা







