ট্রাম্পের নৌ-বহর পাঠানোর জবাবে ইরানের চরম হুঁশিয়ারি

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপকূলের দিকে বিশাল নৌ-বহর পাঠানোর ঘোষণার পর পাল্টা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সংস্থাটির শীর্ষ কমান্ডার জানিয়েছেন, যেকোনো মার্কিন আগ্রাসনের জবাব দিতে তাদের “আঙুল এখন বন্দুকের ট্রিগারে”।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপৌর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেন কোনো ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশ না করে। তিনি গত বছরের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইরান তখন যেমন কঠোর জবাব দিয়েছিল, ভবিষ্যতেও তার ব্যতিক্রম হবে না।
পাকপৌর বলেন, “আইআরজিসি যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি প্রস্তুত। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। প্রয়োজনে ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে।”
এর আগে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সভা শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “জাস্ট ইন কেস ব্যবহারের জন্য আমরা ইরানের দিকে একটি বিশাল নৌ-বহর পাঠিয়েছি। আমি সংঘাত চাই না, তবে ইরানের ওপর আমরা খুব কড়া নজর রাখছি।”
ট্রাম্পের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, কূটনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনা খোলা রাখলেও সামরিক বিকল্প পুরোপুরি বাদ দিচ্ছে না ওয়াশিংটন।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরেও অস্থিরতা চরমে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যা কার্যত ইরানের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে নজিরবিহীন ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ জারি রয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলও নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইরান সরকার প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে, এসব সহিংসতায় ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২,৪২৭ জনকে তারা ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা নির্দোষ পথচারী বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব ভিন্ন। নরওয়েভিত্তিক ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ জানিয়েছে, তারা অন্তত ৩,৪২৮ জন নিহতের তথ্য যাচাই করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৪,৯০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং এ পর্যন্ত ২৬,৫৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু অধিকারকর্মীর দাবি, নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে ইরানের জয়েন্ট কমান্ড সদর দপ্তরের জেনারেল আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থ ইরানের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চলমান বিক্ষোভ ও অস্থিরতাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের “কাপুরুষোচিত প্রতিশোধমূলক ষড়যন্ত্র” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ দেশটিকে দুর্বল করারই একটি কৌশল।
সব মিলিয়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ত্রিমুখী সংকটে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিপজ্জনক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝি পুরো অঞ্চলকে নতুন এক বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ভিওডি বাংলা/জা







