রিজওয়ানা হাসান
পরিবেশ সংকট দেড় বছরে সমাধান সম্ভব নয়

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে গড়ে ওঠা অব্যবস্থাপনা, দূষণ ও পরিবেশগত সংকট দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে পুরোপুরি সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তবে তিনি জানান, বর্তমান সরকার একটি স্বচ্ছ ও কাঠামোগত সমাধান প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করছে, যা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, সমস্যার পাহাড় রাতারাতি সরানো সম্ভব নয়। চীন যে সমস্যা ১০ বছরে সমাধান করতে পারেনি, তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেড় বছরে প্রত্যাশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
ইশতেহার নয়, দরকার বাস্তবায়নের রোডম্যাপ
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে ভালো প্রতিশ্রুতির অভাব নেই, কিন্তু বড় ঘাটতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপে। রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তার বাইরে এসে দায়বদ্ধ আচরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—তা নির্দিষ্ট না হলে জনগণ কোনো সুফল পায় না।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গত চারটি নির্বাচনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে বারবার অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তবে তা আজও পূরণ হয়নি। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
আগামী সরকারের জন্য সাত দফা পরিবেশ অ্যাজেন্ডা
ভবিষ্যৎ সরকারের করণীয় হিসেবে তিনি সাতটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দেন—
১. বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ : ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানির মান ইউরো-৪ থেকে ইউরো-৬ এ উন্নীত করা।
২. শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ : পুলিশ সার্জেন্টদের সরাসরি জরিমানার ক্ষমতা দিয়ে নতুন বিধিমালা কার্যকর করা।
৩. বন পুনরুদ্ধার : দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং প্রাকৃতিক বন অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধ রাখা।
৪. বন্যপ্রাণী কল্যাণ : বন্যপ্রাণী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় আইন কঠোর প্রয়োগ।
৫. শিল্প দূষণ রোধ : অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দূষণ নিয়ন্ত্রণ।
৬. আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা : তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজসহ বড় প্রকল্পের ফিজিবিলিটি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।
৭. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : বিভাগীয় শহরগুলোতে উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সার উৎপাদন।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
রিজওয়ানা হাসান জানান, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এই প্রথম যানবাহন স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। দূষণ কমাতে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস আমদানির প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) থেকে ২০ হাজার একর বনভূমি এবং কক্সবাজারে প্রশাসনের ট্রেনিং সেন্টারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৭০০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চলছে।
জনগণ ও ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি বার্তা
বুড়িগঙ্গা নদীর নিচে ৫ থেকে ৭ মিটার পলিথিন স্তরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পলিথিনমুক্ত বাজার চাইলে কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না—জনগণকেও আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।
ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে সহযোগিতা করা হবে, তবে পরিবেশবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিবেশগত ভিত্তি তৈরি করছে, আগামী সরকার তা আরও সুদৃঢ় করবে এবং পরিবেশকে উন্নয়নের প্রান্তিক নয়, মূল রাষ্ট্রীয় অ্যাজেন্ডায় পরিণত করবে।
ভিওডি বাংলা/ এসএম/ আ







