দামের দুশ্চিন্তা কাটেনি
লোকসানেও রাজশাহীতে ব্যাপক আলুচাষ

লোকসান ও ঋণের ভারে জর্জরিত আলুচাষিরা রাজশাহী জেলায় এবারো ব্যাপক জমিতে আলু চাষ করেছেন। যদিও গতবছরের তুলনায় শুধুমাত্র দামের ধসে আবাদ কমেছে ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে। কিন্তু এতটায় কম ছিল যে সচেতনমহল ধারনা করেছিলেন গতবারের অর্ধেক জমিতেও আলুচাষ হবে না। তবে আলু চাষিদের হতাশার আশংকা এখনো পিছু ছাড়েনি। কারণ সবজির মধ্যে সবচেয়ে কমদাম আলুর কেজিতে।
গত মৌসুমের আলু বিক্রিতে লোকসানের কারণে এবার রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে আলুচাষ কম হয়েছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে (২০২৫) এ জেলায় ৩৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এবার তা কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। কারণ উৎপাদন থেকে শুরু করে বিক্রির শেষ পর্যস্ত আলুর দাম এতটাই কম ছিল যে- কোন চাষির উৎপাদন খরচই উঠেনি। এমনকি লোকসান এড়ানোর আশায় খোদ কৃষকই আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বিধিবাম। লাভ তো দুরের কথা বাড়ি থেকে টাকা দিয়ে হিমাগারের ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে। এমনকি সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর কেজি ২২ টাকা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে ভুক্তভোগিরা দাবি করেছেন। আলু ২২ কেজি দরে বিক্রি করতে পারলেও লোকসানের ৮০শতাংশ পুষিয়ে যেত বলে জানান চাষিরা।
মোহনপুর উপজেলার মৌগাছী এলাকার এক শিক্ষক নিজের বাড়ির ও কিছু আলু কিনে হিমাগারে রেখেছিলেন। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ায় তিনি আশা করেছিলেন ডিসেম্বরের শেষে আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৪-১৫ টাকা কেজি দরের আলু ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এতে হিমাগারের ঋণ শোধ করতে ঘর থেকে পৌনে তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন ‘আমার দেড় বছরের চাকরির টাকায় চলে গেছে।
এরপরেও লোকসান পুষিয়ে নিতে আবারো আলু চাষ করেছেন চাষিরা। সবুজের চাদরে মাঠ ঢেকে গেছে। এখন পুরোদমে ক্ষেতের যত্নে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। বর্তমানে আলু চাষের অনুকুল আবহাওয়া বিরাজ করায় মাঠে মাঠে চাষিরা হয় আলুর দাঁড়ার ওপরে শেষবারের মত মাটি তুলে দিচ্ছেন। আবার কেহ সেচ দিচ্ছেন, নয় কীটনাশক স্প্রে করছেন।
দেড় দশক থেকে জেলার সবচেয়ে বেশি ও ভালো জাতের আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। সেখানকার চাষিরাও এবার আলু চাষ কমিয়েছেন। গত বছর তানোরে ১৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এবার হয়েছে ১২ হাজার ২৬৫ হেক্টরে।
রাজশাহী জেলায় চলতি মৌসুমে ব্যাপক পরিসরে আলুর চাষ হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছেন কৃষকরা। বর্তমানে আলু খেতের পরিচর্যা, সেচ, আগাছা দমন ও রোগবালাই প্রতিরোধে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা থাকায় এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এবারে লক্ষমাত্রার চেয়েও কম জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। জেলায় উফশী আলু ৩১ হাজার ৪৭৪ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এর মধ্যে মতিহারে ১০ হেক্টর, বোয়ালিয়ায় ৩৫ হেক্টর, পবা উপজেলায় ৩ হাজার ৪১০ হেক্টর, তানোরে ১২ হাজার ২৫৫ হেক্টর, মোহনপুরে ৪ হাজার ৪৯৫ হেক্টর, এছাড়া বাগমারা উপজেলায় ৬ হাজার ৪৮৫ হেক্টর, দুর্গাপুরে ১ হাজার ৫২০ হেক্টর, পুঠিয়ায় ৭৭০ হেক্টর, গোদাগাড়ীতে ২ হাজার ৯২ হেক্টর, চারঘাটে ১৮০ হেক্টর, বাঘায় ২২২ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে ও ২ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের (দেশী) আলু চাষ করা হয়েছে।
এবার ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর মধ্যে রাজশাহীর পবা, বাগমারা, মোহনপুর, তানোর, গোদাগাড়ী ও দুর্গাপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয়েছে। সবচাইতে বেশি চাষ হয়েছে তানোর উপজেলায়। উন্নত জাতের আলু, সঠিক সময় রোপণ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে খেতগুলোতে গাছের বৃদ্ধি ভালো দেখা যাচ্ছে।
মোহনপুর উপজেলার মৌগাছী গ্রামের আলুচাষি আব্দুল আলীম বলেন, এবার সময়মতো বীজ রোপণ করতে পেরেছি। আবহাওয়াও অনুকূলে আছে। এখন নিয়মিত সেচ ও সার দিচ্ছি। আলু গাছ ভালো অবস্থায় আছে। যদি কোনো বড় রোগ না লাগে আর বাজারে ন্যায্য দাম পাই, তাহলে লাভ ভালোই হবে।
বাগমারা উপজেলার কামারপাড়া এলাকার কোরবান আলী বলেন, আলু চাষে খরচ আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। বীজ, সার আর শ্রমিকের মজুরি সবই বেশি। তারপরও ফলন ভালো হলে সেই খরচ উঠে আসবে। এখন প্রতিদিন খেতে গিয়ে পরিচর্যা করছি।
জেলার অনেক কৃষক বলেন, গত বছর অনেক কৃষক আলু চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারপরও এবার ঝুঁকি নিয়ে চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত আলুর অবস্থা ভালো। তরতাজা গাছ ক্ষেতে ক্ষেতে বিরাজ করছে। সরকার যদি সংরক্ষণ আর বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে, তাহলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন বলে জানান।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত বীজ, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো রোগবালাইয়ের খবর পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ভালো উৎপাদনের আশা করা যাচ্ছে। আরও কিছু জমিতে আলু চাষ হবে। সেগুলো হলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/ মোঃ রমজান আলী/ আ







