৩৬ দফার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করল এনসিপি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক রূপরেখা ও অঙ্গীকার তুলে ধরে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম প্রধান শরিক দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকালে রাজধানীর গুলশানে লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলের ‘লা ভিতা’ হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১২টি অধ্যায়ে ৩৬ দফার এই ইশতেহার জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।
‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’-এ নাজুক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণসহ তরুণদের ক্ষমতায়ন ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, দলের মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দলের শীর্ষ নেতারা।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহার
১. জুলাই সনদের যেসব দফা আইন ও আদেশের ওপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ের গণহত্যা, শাপলা চত্বর গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করা হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতিসত্তার পরিচয়ের কারণে যেকোনও ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ ও নিপীড়ন প্রতিহত করতে মানবাধিকার কমিশনের অধীন একটি বিশেষ স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সব জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব এবং সরকারি ব্যয়ের বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫. আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে পারফরম্যান্সভিত্তিক পদোন্নতি হবে। প্রতি তিন বছর অন্তর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পে-স্কেল হালনাগাদ করা হবে এবং এতে ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
৬. কার্ডের জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সব নাগরিক সেবা প্রাপ্তির প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বিমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮. স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের পণ্য ট্রাকে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত কাছের মুদি দোকান থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০. গরিব ও মধ্যবিত্তের কর কমিয়ে কর-জিডিপি ১২ শতাংশে উন্নীত করা হবে। কর ফাঁকি বন্ধ করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
১১. পরিকল্পিতভাবে এলডিসি উত্তরণের জন্য আগাম এফটিএ সিইপিএ করা হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেস ও কঠোর আইনসহ তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার করা হবে।
১২. চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করে ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামানো হবে। ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩. মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানো হবে। রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা হবে এবং তরুণদের মতামত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ইয়ুথ সিভিক কাউন্সিল (Youth Civic Council) গঠন করা হবে।
১৫. পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল এবং প্রথম পাঁচ বছর করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে।
১৬. বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তুলতে সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট ও ভাষা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
১৭. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিভিন্ন মাধ্যমের সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের পৃথক বেতন কাঠামো এবং পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।
১৮. উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের যোগসূত্র বাড়াতে স্নাতক পর্যায়ে ছয় মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বা থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের দেশে ফেরাতে ফান্ডিং প্রদান এবং কম্পিউটেশনাল গবেষণার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০. হৃদরোগ, ক্যানসার ও ট্রমার মতো জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন গড়ে তোলা হবে।
২১. দুর্গম অঞ্চলে জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও ইমার্জেন্সি প্যারামেডিক টিম নিশ্চিত করা হবে। প্রতি জেলায় হাসপাতালে আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা থাকবে।
২২. এনআইডি-ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড গড়ে তোলা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় আনা হবে।
২৩. সংসদে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
২৪. পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ ও ডে-কেয়ার সুবিধা থাকবে।
২৫. উপজেলা পর্যায়ে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রী সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরবরাহ করা হবে।
২৬. প্রবাসীদের পাসপোর্ট, এনআইডি ও কনস্যুলার সেবা এক জায়গায় দিতে ‘ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল পোর্টাল’ গড়ে তোলা হবে।
২৭. রেমিট্যান্সের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে রেমিটমাইলস (RemitMiles) নামে ট্রাভেল মাইলস দেওয়া হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও আদিবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং মালবাহী ট্রেন বাড়িয়ে সড়কপথের জট কমানো হবে।
৩০. পাঁচ বছরে বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন এবং সরকারি ক্রয়ে ৪০ শতাংশ ইলেকট্রিক ভেহিকল নিশ্চিত করা হবে।
৩১. শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক করা এবং নদী-খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
৩২. এনআইডি যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ভর্তুকির টাকা পাঠানো হবে এবং মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়ে খাদ্যে ভেজালকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৩৪. সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দৃঢ় কূটনৈতিক ভূমিকা রাখা হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালত ও সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া হবে।
৩৫. রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক সমাধান এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত ফোর্সের দ্বিগুণ আকারের রিজার্ভ ফোর্স তৈরি এবং সেনাবাহিনীতে ইউএভি (ড্রোন) ব্রিগেড ও সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম যুক্ত করা হবে।
ভিওডি বাংলা/ এম/ আরিফ







