বেলুচিস্তানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ৩ দিনে নিহত ২৫৫

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে ভয়াবহ সহিংসতায় তিন দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৫ জনে। দেশটির সেনাবাহিনী পরিচালিত টানা সামরিক অভিযানে অন্তত ১৯৭ জন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২২ জন পাকিস্তানি সেনাসদস্য। সংঘর্ষের শিকার হয়ে শিশুসহ আরও ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম জিও নিউজ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩১ জানুয়ারি বেলুচিস্তানজুড়ে সমন্বিত ও পরিকল্পিত হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ওইদিন একযোগে প্রদেশের অন্তত ১২টি শহর ও জনপদে হামলা চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। এসব হামলায় প্রথম দিনেই ১৭ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
হামলার ধারাবাহিকতা থামেনি পরবর্তী দিনগুলোতেও। সপ্তাহান্তে কোয়েটা, মাস্তুং, নুশকি, দালবান্দিন, খারান, পাঞ্জগুর, টুম্প, গোয়াদার ও পাসনিসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ মোট ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হামলার পরপরই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেলুচিস্তানজুড়ে ব্যাপক ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু করে। অভিযানের প্রথম ধাপেই ৯২ জন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হন। এদের মধ্যে তিনজন আত্মঘাতী হামলাকারী ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’-এর জঙ্গিরা নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও শ্রমিকসহ অন্তত ১৮ জন নিরীহ নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এসব হামলার মূল লক্ষ্য ছিল বেলুচিস্তানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত করা।
আইএসপিআর আরও জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী অটল সাহস, পেশাদার দক্ষতা ও সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে জঙ্গিদের অপচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। তবে তীব্র সংঘর্ষ ও দীর্ঘস্থায়ী মুখোমুখি লড়াইয়ে ওইদিনই ১৫ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন।
পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও সন্দেহভাজন এলাকাগুলোতে স্যানিটাইজেশন অপারেশন চালানো হয়। এর লক্ষ্য ছিল হামলার পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী ও মদদদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। সেনাবাহিনীর দাবি, অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
আইএসপিআরের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রমাণ মিলেছে যে এসব হামলার পরিকল্পনা ও নির্দেশনা পাকিস্তানের বাইরে অবস্থানরত জঙ্গি নেতাদের কাছ থেকে এসেছে। হামলার পুরো সময় তারা হামলাকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচ লিবারেশন আর্মি বেলুচিস্তানে কাজ করা অন্যান্য প্রদেশের পাকিস্তানি নাগরিক এবং বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। গত বছর সংগঠনটি প্রায় ৪৫০ যাত্রী বহনকারী একটি ট্রেনে হামলা চালায়। এতে দুই দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দেয়।
পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, বিএলএকে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে ভারত। এ কারণে দেশটির সরকারি ভাষ্যে সংগঠনটিকে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ নামে অভিহিত করা হয়। ভারত অবশ্য এ অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করে আসছে।
চলমান এই সহিংসতা বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ছাড়া এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
ভিওডি বাংলা/জা







