শুল্ক কমানোর পরও বেড়েছে খেজুরের দাম

রমজান মাসের আগমনীকালে বাংলাদেশের বাজারে খেজুরের দাম ইতোমধ্যেই হু হু করে বেড়েছে। সরকারের শুল্ক হ্রাসের পদক্ষেপও এই প্রবণতাকে আটকাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুল্ক কমানো মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারে দাম কমবে না, কারণ সিন্ডিকেট এবং আমদানিকরদের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা থাকে।
গত এক মাসে বাজারে জাতভেদ অনুযায়ী খেজুরের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানের খেজুরের দামও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রায় ১০০ টাকা বেড়েছে। পাইকারি এবং খুচরা বাজারের পার্থক্য আরও প্রগাঢ়; অনেক ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে খেজুর ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিবছর রমজানকে সামনে রেখে সরকার খেজুরকে বিলাসবহুল পণ্যের তকমা দিয়ে শুল্ক হার কমিয়ে থাকে। এইবারও ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। লক্ষ্য ছিল আমদানি বাড়ানো এবং দামকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা। তবে বাস্তবে দাম উল্টোভাবে বেড়েছে।

রাজধানীর বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জাহিদী খেজুর কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়, যেখানে এক মাস আগে দাম ছিল ২৫০ টাকা। অর্থাৎ কেবল জাহিদী জাতের খেজুরের দাম এক মাসে বেড়েছে ৭০ থেকে ১০০ টাকা। ইরানি মরিয়ম খেজুর কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায়, এক মাস আগে যা ছিল ১০০০ থেকে ১১৫০ টাকা। কালমি মরিয়মের দাম বেড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং সুক্কারি জাতের খেজুরের দাম এক মাসে ২০০ টাকা বাড়ে, যা এখন ৮০০ টাকা।
এছাড়া আজুয়া, বরই, দাবাস, মাবরুম, মেডজুল ও আম্বারাসহ প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিকেজি আজুয়া খেজুর ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা, বরই ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, দাবাস ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, মাবরুম ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং আম্বারা ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মানিকনগরের মুন্না এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মহসিন মোল্লা জানান, “এক মাস আগের তুলনায় প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম ১০০ টাকার ওপরে বেড়েছে। সরকার শুল্ক কমালেও সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। আমরা কম দামে না কিনতে পারলে কম দামে বিক্রি করবো কীভাবে?”
পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বাদামতলীর তুলনায় খুচরা বাজারে খেজুরের দাম ধরনভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি। জাহিদী খেজুরের ৫ কেজি প্যাকেট পাইকারি বাজারে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কেজি দরে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা। ইরানি মরিয়মের ৫ কেজি প্যাকেট ৫০০০ থেকে ৬২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালমি মরিয়ম ৫ কেজি ৩৪০০ থেকে ৩৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কেজি দরে ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা।
বাদামতলী পাইকারী বাজারের সেসার্স আর এন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. এমদাদুল করিম বলেন, “গত এক মাসে খেজুরের দাম সামান্য বেড়েছে। তবে, গত বছরের তুলনায় এখনো দাম কম। আমদানিকারকরা জানিয়েছে সৌদি, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে খেজুরের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বিক্রি দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ গত বছরের তুলনায় এবার কম দামে খেজুর কিনতে পারবেন।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে দাম বৃদ্ধি মূলত সরবরাহ সংকট, আমদানির ব্যয় ও পাইকারি সিন্ডিকেটের কারণে। রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকায় দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবে শুল্ক কমানো সত্ত্বেও দাম কমেনি, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন ধরনের খেজুরের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় জাহিদী ও ইরানি মরিয়ম খেজুরে দাম বৃদ্ধির ধাক্কা ক্রেতাদের আয় সীমার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য রমজান মাসে খেজুর কেনা এখন ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
মোটকথা, শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দাম ব্যবধান ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, শুধুমাত্র শুল্ক কমানো যথেষ্ট নয়; বাজার মনিটরিং, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ বৃদ্ধি না হলে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে বাজারে খেজুরের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ক্রেতাদের বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেছেন, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে দাম কিছুটা স্থিতিশীল করা সম্ভব হতে পারে।
ভিওডি বাংলা/জা







