বাংলাদেশের প্রথম এমভিএনও সিমের যাত্রা শুরু

দেশে প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল টেলিকম অপারেটর (এমভিএনও) সিম চালু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে লাইভ পাইলট প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে গ্রাহকদের জন্য বর্তমানে আনলিমিটেড ভয়েস কল, আনলিমিটেড ডেটা এবং কোয়াড-প্লে সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, খুব শিগগিরই সাধারণ গ্রাহকরা এই সেবা ব্যবহার করতে পারবেন।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছিলেন যে, দেশের প্রথম বিটিসিএল এমভিএনও সিম সচল হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, ভয়েস কল, ডেটা কল, আলাপ টু মোবাইল নেটওয়ার্ক, আলাপ টু আলাপ এবং জিপন ইন্টিগ্রেশন-এই চারটি ইভেন্টের সফল প্রভিশনিং সম্পন্ন হয়েছে। এর পাশাপাশি কল টেস্টও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আরও জানান, বিটিসিএল গুলিস্তান এবং রমনা অফিসে সরেজমিন প্রভিশনিং, অ্যাক্টিভেশন ও টেস্ট কল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বর্তমানে এমভিএনও এবং ট্রিপল প্লে সেবা একসঙ্গে চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে, দেশের টেলিকম খাতে বিটিসিএলের এই উদ্যোগকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এমভিএনও সিমের মাধ্যমে আনলিমিটেড কোয়াড-প্লে সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে, যা ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এবং সেবা উদ্ভাবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৩ ফেব্রুয়ারি রমনা অফিস পরিদর্শনকালে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, এমভিএনও মডেলে নিজস্ব মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ছাড়াই গ্রাহকদের জন্য আনলিমিটেড মোবাইল সেবা প্রদান করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিটিসিএল টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই সেবা চালু করছে।
এ সেবার আওতায় গ্রাহকরা পাবেন:
আনলিমিটেড ভয়েস কল, আনলিমিটেড ইন্টারনেট, অ্যাপভিত্তিক আইপি কলিং সেবা ‘আলাপ’, জিপন কানেকশন ও রাউটারের মাধ্যমে দ্রুত ইন্টারনেট, জনপ্রিয় ওটিটি কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘টফি’ ও সবগুলো সেবা একসঙ্গে প্রদান করে কোয়াড-প্লে সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর বিটিসিএলকে পরীক্ষামূলকভাবে এমভিএনও নেটওয়ার্ক চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই আধুনিক প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সেবায় নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হবে।
এমভিএনও কী এবং কিভাবে কাজ করে?
ভার্চুয়াল মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমভিএনও) হলো এমন একটি অপারেটর, যা নিজস্ব নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ছাড়া অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে টেলিকম সেবা প্রদান করে। এমভিএনওর নিজস্ব স্পেকট্রাম লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না এবং নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ খরচও নেই। তারা অন্য অপারেটরের অব্যবহৃত নেটওয়ার্ক ক্যাপাসিটি পাইকারি মূল্যে ক্রয় করে এবং গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে।
যেসব অপারেটরের অতিরিক্ত নেটওয়ার্ক সক্ষমতা থাকে অথবা স্পেকট্রাম লাইসেন্স অনুযায়ী পর্যাপ্ত গ্রাহক নেই, তারা উদ্বৃত্ত নেটওয়ার্ক বিক্রি করে। এতে মূল অপারেটর ও এমভিএনও-দুই পক্ষই লাভবান হয়। এমভিএনওর পরিচালন খরচ কম হওয়ায় কল ও ডেটার রেটও সাধারণত কম থাকে। একাধিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় গ্রাহকরা নেটওয়ার্কজনিত সমস্যা কমে এবং কভারেজ উন্নত হয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্কসহ বিভিন্ন দেশে এমভিএনও চালু হওয়ার পর গ্রাহকরা কম খরচে উন্নত সেবা পেয়েছেন। ২০০০ সালে ডেনমার্কে বিশ্বের প্রথম এমভিএনও যাত্রা শুরু করে। ২০০৮ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ৪০টিরও বেশি এমভিএনও চালু হয়েছিল।
এমভিএনওর ধরন
এমভিএনওর চারটি প্রধান ধরন আছে, ব্র্যান্ডেড রিসেলার এমভিএনও, মূলত একটি এমএনও-এর অধীনে কাজ করে।
একই প্রতিষ্ঠানের দুটি আলাদা ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন গ্রাহক সম্প্রদায় আকৃষ্ট করতে ব্যবহৃত হয়।
থিন এমভিএনও:
ব্র্যান্ডেড রিসেলারের মতো হলেও নিজস্ব কাস্টমার সাপোর্ট, বিলিং ও ট্যারিফ থাকে। মূল অপারেটরের সিম ও নাম্বার সিরিজ ব্যবহার করে।
মিডিয়াম এমভিএনও:
নিজস্ব ব্র্যান্ডের সিম ও নাম্বার বিক্রি করতে পারে। ভ্যালু-অ্যাডেড সার্ভিস প্রদান সম্ভব।
ফুল এমভিএনও (বিটিসিএল মডেল):
একাধিক অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারে। নিজস্ব সিম, নম্বর, ব্র্যান্ডিং ও কাস্টমার সেবা অবকাঠামো থাকবে। আলাদা ধরনের সেবার জন্য পৃথক সিম ও অফার থাকবে।
গ্রাহকের সুবিধা
বিটিসিএলের এমভিএনও সেবা গ্রাহকদের জন্য নানা সুবিধা নিয়ে এসেছে: একটি সংযোগ থেকে একাধিক সেবা: ভয়েস কল, মোবাইল ডেটা, ডেটা কলিং ও জিপন ইন্টারনেট একসঙ্গে ব্যবহার করা যাবে।
নেটওয়ার্কজনিত সমস্যা কমানো: একাধিক অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে কভারেজ উন্নত হবে।
কম খরচে সেবা: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এমভিএনও পাইকারি মূল্যে কল ও ডেটা প্যাক বিক্রি করে, যা গ্রাহকদের জন্য লাভজনক।
উন্নত ডিজিটাল কনটেন্ট: টফি ও অন্যান্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনোদনমূলক কনটেন্ট সহজলভ্য।
কোয়াড-প্লে সুবিধা: আনলিমিটেড ভয়েস, ডেটা, ব্রডব্যান্ড ও ডিজিটাল কনটেন্ট একসঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ।
বিটিসিএল জানিয়েছে, গ্রাহকদের সর্বনিম্ন মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
বিটিসিএলের এমভিএনও সিমের মাধ্যমে দেশের টেলিকম খাতে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। নিজস্ব নেটওয়ার্ক ছাড়াই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাহকরা কম খরচে, উন্নত এবং বহুমুখী টেলিকম সেবা উপভোগ করতে পারবে। আনলিমিটেড কল, ডেটা, কোয়াড-প্লে সুবিধা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট সেবা একসঙ্গে মিলিয়ে এটি ডিজিটাল কানেক্টিভিটি বৃদ্ধিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/জা







