• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

রয়টার্সের প্রতিবেদন:

রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার পথে বিএনপি চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৯ পি.এম.
দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই দশক ধরে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর দেশে ফিরে আসার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের নয়-বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্নবিদ্ধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় মোড় ঘোরানোর সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনমত জরিপগুলো সঠিক হলে এবারের নির্বাচনে তারেক রহমানের বিজয় এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রতিবেদনে তাকে “মৃদুভাষী কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দৃঢ়” নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে এবারের জাতীয় নির্বাচন আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। প্রায় ১৫ বছর ধরে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোটাধিকার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছিল, সেই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সীমিত ছিল বলে অভিযোগ ছিল বিরোধী দলগুলোর। সে কারণে এবারের নির্বাচনের দিকে শুধু দেশবাসী নয়, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিও নিবদ্ধ।

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ২০০৮ সালে দেশ ছাড়েন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আটক থেকে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজন দেখিয়ে তিনি লন্ডনে যান এবং সেখানেই দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। নির্বাসিত জীবনকালে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকলেও সরাসরি মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ঢাকায় অবতরণের সময় তাকে ঘিরে জনসমাগম ও উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে “বীরের মতো” স্বাগত জানান। এরপর থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সফর করে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন। দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-এই দুই পরিবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।

তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন শীর্ষস্থানীয় সংগঠক এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ভারতের নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশকে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না রেখে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

নির্বাচনী ইশতেহার ও বক্তব্যে তারেক রহমান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে-

দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, খেলনা, চামড়াজাত পণ্যসহ নতুন শিল্প খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে পোশাক রপ্তানিনির্ভরতা কমানো, স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফা, অর্থাৎ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা, তার মতে, এসব পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

স্ত্রী ও কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পর জীবন যে কত দ্রুত বদলে গেছে, তা নিজেই স্বীকার করেছেন তারেক রহমান। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ঢাকায় অবতরণের পর থেকে প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটে গেছে, আমি নিজেই জানি না।”

তিনি জানান, তার মেয়ে জাইমা রহমান বাবার পক্ষে সমর্থন আদায়ে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।

তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও মাঝপথে তা ছেড়ে দিয়ে টেক্সটাইল ও কৃষিপণ্য ব্যবসায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে রাজনীতিতেই তার সম্পূর্ণ মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়।

শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক দুর্নীতি মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তার অনুপস্থিতিতেই বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
২০০৪ সালে শেখ হাসিনার এক জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই হামলায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।

তবে শুরু থেকেই তারেক রহমান এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি সব মামলা থেকেই খালাস পান।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান প্রতিশোধের রাজনীতির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, “প্রতিশোধ কারও জন্য কী বয়ে আনে? প্রতিশোধের কারণে মানুষকে দেশ থেকে পালাতে হয়। এতে ভালো কিছু আসে না। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।” তার বক্তব্যে সংযম, পুনর্মিলন ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের আহ্বান স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

নির্বাসনে থাকাকালীন দলীয় সংকট, নেতাদের গ্রেপ্তার, কর্মীদের নিখোঁজ হওয়া এবং কার্যালয় বন্ধের ঘটনা কাছ থেকে দেখেছেন তারেক রহমান। দেশে ফিরে তিনি স্পষ্টভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক স্টাইল গ্রহণ করেছেন।

তিনি আক্রমণাত্মক বক্তব্য এড়িয়ে চলছেন এবং ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ পুনরুদ্ধারের কথা বলছেন। বিএনপির ভেতরে তার অবস্থান শক্তিশালী বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনী কৌশল ও জোট আলোচনা-সবকিছুতেই তারেক রহমান এখন সরাসরি তদারকি করছেন।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও টিকিয়ে রাখাকে নিজের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র অনুশীলনের মাধ্যমেই আমরা আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ ও পুনর্গঠন করতে পারি। গণতন্ত্র থাকলেই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।”

রয়টার্সের মতে, এবারের নির্বাচন তারেক রহমানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
সারাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ অনুকূলে: মির্জা ফখরুল
সারাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ অনুকূলে: মির্জা ফখরুল
কোনো ভুল করা যাবে না, যাতে ভোটের ফলাফল ক্ষতি হয়
আবদুস সালাম: কোনো ভুল করা যাবে না, যাতে ভোটের ফলাফল ক্ষতি হয়
বিএনপি মিডিয়া সেলের আলী মামুদের মরদেহ উদ্ধার
বিএনপি মিডিয়া সেলের আলী মামুদের মরদেহ উদ্ধার