ব্যর্থতা নয়, অর্জনে বিশ্বাস: ফরিদা আখতার

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, তিনি ব্যর্থতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন না। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র ১৫-১৬ মাসের কাজ দিয়ে খাতের পূর্ণ অগ্রগতি বোঝা যাবে না। আমরা অনেক নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি, যার সুফল ধীরে ধীরে পাওয়া যাবে।”
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মন্ত্রণালয়ের কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মাছ ও মাংসের দাম বৃদ্ধি আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। আমাদের দায়িত্ব হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, আহরণ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
উপদেষ্টা জানান, গবাদিপশু ও মাছ উৎপাদনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুধুমাত্র সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল মোটাতাজাকরণের বদলে মানসম্মত উৎপাদন, ভ্যাকসিন ও চিকিৎসার উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হয়েছে। অতিরিক্ত আহরণের কারণে মাছের প্রাপ্যতা কমায়, গভীর সমুদ্র ব্যতীত সোনার ব্যবহার দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা, ২০২৬’, ‘প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ বীমা নীতিমালা, ২০২৬’, ‘জাতীয় কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা, ২০২৬ (খসড়া)’ এবং ‘ভেটেরিনারি ঔষধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ (খসড়া)’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে খামারিদের বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট সুবিধা এবং এ খাতে ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
উপদেষ্টা বলেন, জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত উপকারভোগী জেলের সংখ্যা ১৩,২৬,৪৮৬ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর এলাকার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা সময়ে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আসছেন।
তিনি বলেন, ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ৬টি অভয়াশ্রম এবং বঙ্গোপসাগরে ৭,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ সংরক্ষণে দেশে ৬৬৯টি অভয়াশ্রম পরিচালিত হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭টি অভয়াশ্রম রয়েছে। এর মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়লেও এই লেক অবৈধ দখল ও শহরের দূষণের শিকার হচ্ছে।
মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, হালদা নদীকে ‘মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করে ৫ নভেম্বর ২০২৫ গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। নদীর প্রজনন ক্ষেত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৬টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে হালদা থেকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। হালদা থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে ৮০০ কোটি টাকার অধিক অবদান রাখছে।
প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, পিপিআর নির্মূলে ৩ কোটি ৬১ লক্ষাধিক ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে। ক্ষুরারোগ (FMD) নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৪৬ লক্ষ এর অধিক ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ১৭টি রোগের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৬ লক্ষ ৬২ হাজার ৪ শত ৬২ ডোজ গবাদিপশুর টিকা এবং ৫৩ কোটি ৯৫ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬ শত ডোজ হাঁস-মুরগির টিকা উৎপাদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স (AMR) প্রতিরোধে স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন প্রণয়ন, স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন চালু এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদার করার লক্ষ্যে জুনোটিক রোগ নির্ণয় ও নজরদারি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষায়িত ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে।
রমজানে সুলভ মূল্যে বিক্রয়ের জন্য ২৬ দিন ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, যেখানে ড্রেসড ব্রয়লার, দুধ, ডিম ও গরুর মাংস বিক্রি করা হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তা ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে, ২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত COP30 সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমবর্ধমান, যা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, “মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে এখনও ‘কৃষির উপখাত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা, উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে খাতের অবদান অপরিসীম। প্রধান উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা কমিশনের নিকট পূর্ণাঙ্গ খাতের মর্যাদা ও প্রাপ্য সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধি, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।”
ভিওডি বাংলা/জা







