• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

উৎসবের ভোট, আছে সংঘাতের শঙ্কাও

রেজাউল করিম হীরা    ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:২৬ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা চলবে ভোট গ্রহণ চলবে ২৯৯ আসনে। একটি আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে। 

নিবন্ধিত ৬০ দলের মধ্যে ৫০টি দল এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। জামায়াতের প্রার্থী মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে  নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।  বুধবার সকালে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। ১৯৯৬ সালের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগবিহীন প্রথম এই নির্বাচনে বিজয়ী হবে কোন রাজনৈতিক দল বা জোট- তা নিয়ে এখন সর্বত্র  আলোচনা চলছে।

দেশে এর আগে একাধিকবার গণভোট হলেও সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট এবারই প্রথম। এরই মধ্যে ভোটগ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবারের ভোট নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস  দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে এমন উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। মাঝখানে দলীয় সরকারের অধীনে তিন সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল খুবই কম। এসব নির্বাচনে নানা অনিয়মের কারেণ সাধারণ ভোটাররা ছিলেন কেন্দ্রবিমুখ।  ফলে গত দেড় দশকে ভোটাধিকার বঞ্চিত থাকা মানুষেরা ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাজানো, পাতানো ও ভোটাধিকার হরণের বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে তরুণদের বড় অংশই ভোট দিতে পারেননি। এবার ভোটকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতি ব্যাপক হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে উৎসবের আমেজ থাকলেও, নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ও সহিংসতা নিয়ে ব্যাপক শঙ্কাও রয়েছে।
প্রার্থী ও ভোটাররা আগে থেকেই শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, সংঘর্ষ, সহিংসতা, ভোটপ্রদানে বাধার আশঙ্কার কথা ইতিমধ্যে নানা শঙ্কার কথাও ইতিমধ্যে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে।  অতিঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাত হতে পারে- এমন কেন্দ্রের তালিকাও করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানানো হয়েছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসি জানায়, জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি পর্যায়ের দলনিরপেক্ষ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এ টিম গঠন করা হয়েছে। উপজেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বেও ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নির্বাচন মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে।

নির্বাচনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে সমন্বয় ও সুসংহতকরণের লক্ষ্যে রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল গঠন করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ সব কেন্দ্রে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোট বানচালের জন্য যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে পারে। এছাড়া নানা শঙ্কার কথা মাথায় রেখে এবারের জাতীয় নির্বাচনে নিরাপত্তা ছক সাজানো হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, আনসার, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা ছক সাজিয়েছে।  এবারের ভোটের নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। সবক’টি কেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ নেই সেসব এলাকায় সিসি ক্যামেরার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভোটের নিরাপত্তায় ২৫ হাজারের বেশি বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবে পুলিশ। 

সারাদেশের ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪০ শতাংশের ওপরে কেন্দ্রকে নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে ১৩টি আসনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা-৭, পাবনা-১ ও ৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। 

বিভাগওয়ারী আরেকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে ভোট বানচাল করতে পারে এমন তালিকা করা হয়েছে। সেই তালিকায় দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগের ২২টি আসন, ময়মনসিংহের ৮, সিলেটের ২, চট্টগ্রামের ১৬, রংপুর বিভাগে ৭, রাজশাহী বিভাগের ১০, খুলনা ও বরিশালের ১৩ আসন রয়েছে। এ সব আসনের প্রায় ২৯০৬টি কেন্দ্রকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যেখানে সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে। 

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষ হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনী সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তফশিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে পাঁচজন ও বেসরকারি হিসাবে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারের ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগের অভিযোগ জমা পড়েছে ইসিতে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, এবার নির্বাচনে সহিংসতা, সংঘর্ষ, গুলি, গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নাশকতা সহিংসতা বেশি হতে পারে এমন কিছু জেলাকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এমন কিছু জেলাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর দেয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় আগের নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দুর্বৃত্তরা গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে যাতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি করতে না পারে সেদিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ভোটকেন্দ্র দখল, আধিপত্য বিস্তারসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে না পারে সেটিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। 

ঢাকা মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন,  নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠানের জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কেউ আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগ নিলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা।  সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন থাকবে স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্স। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নেতৃত্বে থাকা এসব ফোর্স প্রয়োজনে দ্রুত যেকোনো স্থানে মোতায়েন করা যাবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সোয়াত, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, ক্রাইমসিন ভ্যান ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে। 

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখরভাবে যেন ভোটগ্রহণ হয় সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।  এবার নিরাপত্তা রক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৯০ ভাগ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেছেন, ভোটাররা যেন নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে বিজিবি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করবে।

ভিওডি বাংলা/ আরকেএইচ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মিলছে অ্যান্টিবায়োটিক
আইসিইউর ৪১ শতাংশ রোগী প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মিলছে অ্যান্টিবায়োটিক
নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নির্বাচন ইস্যুতে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচন ইস্যুতে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা