• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

নির্বাচনের আগে হাজার কোটি টাকার বাস কেনায় তাড়াহুড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক    ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:০৬ পি.এম.
বিআরটিসি ৩৪০টি সিএনজি একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস কেনার প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে-ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের শেষ মুহূর্তে ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার বাস কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিদায় নেবে বর্তমান সরকার। নির্বাচনের দুই দিন আগে, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি, এই প্রকল্পের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। এতে প্রশ্ন ওঠছে-এই প্রকল্পের মাধ্যমে কি কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে?

গত ডিসেম্বরে ৩৪০টি বাস কেনার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। এর আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ঠিকাদার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দরপত্র কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় আরও বাড়ানো হয়েছে। আগামী রোববার পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে এবং একই দিন উন্মুক্ত হবে।

খোঁজে জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশিত হবে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতাই কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি ও আর্থিক যাচাই-বাছাই করতে হবে।

প্রকল্প পরিচালক কাজী আইয়ুব আলী বলেন, “শেষ দিনে এসে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া হচ্ছে-এ কথা সঠিক নয়। প্রকল্পের অর্থায়নের গাইডলাইন অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। সব কিছু নিয়ম মেনে হচ্ছে।”

বিআরটিসি উদ্যোগ নেয় ৩৪০টি সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস কেনার। দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে দরপত্রের কিছু শর্ত ও আর্থিক কাঠামো ঘিরে স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। আন্তর্জাতিক দরপত্র অনুযায়ী, বাসের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জামও ক্রয় করা হবে। প্রতিটি বাস সম্পূর্ণ নির্মিত অবস্থায় সরবরাহ করতে হবে।

দরপত্রে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার জামানত দিতে হবে। দরদাতার অবশ্যই কমপক্ষে ২০ বছরের বাস সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এছাড়া, গত ২০ বছরে বিদেশে ২০০টি ডিজেল বাস এবং ৩৪০টি সিএনজি বাস রপ্তানির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রতিবছর কমপক্ষে ২৫০টি সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস তৈরি করতে সক্ষম হতে হবে। দরপত্রে কারখানা ও উৎপাদন সুবিধার প্রমাণ জমা দেওয়ার শর্তও রয়েছে।

পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠান খুব কম। ফলে দরপত্র কার্যত কয়েকটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ হবে। এত বড় সক্ষমতা সাধারণত বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোয় থাকে।

বিআরটিসি জানিয়েছে, প্রথমে টেকনিক্যাল সাব-কমিটি দরপত্র যাচাই করবে। কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আর্থিক প্রস্তাব খোলা হবে এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হবে। তবে অতীতে বিআরটিসির প্রকল্পে কারিগরি মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় ‘টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ’ দেখিয়ে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দেওয়ার অভিযোগও ছিল।

মূল প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) ও ঋণচুক্তির শর্তের বাইরে এসে ঠিকাদার নিয়োগের শর্তও কিছুটা সহজ করা হয়েছে। মূল প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, বাসগুলো কোরিয়ায় নির্মিত হতে হবে। তবে এখন শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব বাস সরবরাহ করবে, তা কোরিয়ায় তৈরি নাও হতে পারে।

বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, “কোনো কিছুই একক সিদ্ধান্তে হচ্ছে না। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বড় ভূমিকা রাখছে। নির্বাচনের আগে টেন্ডার হওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়মমাফিক চলছে। টেন্ডারিং সম্পন্ন হতে ৪৫-৬০ দিন লাগবে। আমাদের কোনো শর্ত পরিবর্তন করা হয়নি। ঠিকাদার নিয়োগের পর বাস সরবরাহ শুরু করতে অন্তত ১৫ মাস সময় লাগবে।”

৩৪০টি সিএনজি বাস প্রকল্প ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ আড়াই বছরে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। প্রশাসনিক জট, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং বিদেশি ঋণদাতার জটিলতার কারণে প্রকল্প স্থবির ছিল। হঠাৎ করেই সব কাজে গতি এসেছে।

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষের লক্ষ্য ছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর নগর পরিবহন আধুনিক করা, বাস রুট পুনর্বিন্যাসে সহায়তা করা এবং ধাপে ধাপে তেলচালিত পুরনো বাস তুলে নেওয়া। রাজধানীর বাইরে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর পরিকল্পনাও ছিল।

প্রকল্পে ৩৪০টির মধ্যে ১৪০টি বাস রাজধানীর বিভিন্ন রুটে এবং বাকি ২০০টি বাইরে চলবে। মোট ব্যয়ের ৮২৯ কোটি টাকা আসছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ থেকে। অবশিষ্ট ৩০৫ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।

অনুমোদনের পরপরই সময়ক্ষেপণ শুরু হয়। প্রকল্প পরিচালক ও কোরিয়ান পরামর্শক নিয়োগ করতে লেগেছে প্রায় ১৫ মাস। এরপর দরপত্র প্রস্তুত করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়। ৯টি দফায় ব্যাংক মন্তব্য পাঠায়, যা সংশোধন করতে করতে সময় আরও পিছিয়ে যায়। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর দরপত্র চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, “বিআরটিসি এত আগ্রহী কেন? তাদের কাছে পর্যাপ্ত গ্যারেজ বা বাস রাখার স্থান নেই। ঢাকার রাস্তায় বাস রাখা বড় সমস্যা। কেনার আগে ঠিক করা উচিত বাস কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে চলবে।”

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
এক মাসে এলো ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স
এক মাসে এলো ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স
আজ থেকে নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল
আজ থেকে নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল
দু’দিনে ভরিতে কমলো ৩০ হাজার টাকার বেশি
দেশেও সোনার বড় পতন: দু’দিনে ভরিতে কমলো ৩০ হাজার টাকার বেশি